২৭ মার্চ ২০১৩
জার্মান এম্ব্যাসী, কুয়ালালামপুর
বসে আছি ভিসা অ্যাপ্লিকেশান জমা দেয়ার অফিসে, আধঘণ্টা অপেক্ষার পর আমার সিরিয়াল এলো। সাথে থাকা এক বান্ডিল(!) ডকুমেন্ট জমা দিলাম কাউন্টারে, কর্তব্যরত জার্মান ভদ্রমহিলা চোখের পলকে সবগুলো ডকুমেন্ট পড়ে বলা শুরু করলেন এই এই ডকুমেন্টগুলোর ক্ষেত্রে এই এই তথ্যগুলোও তাদের লাগবে। বুঝতে পারলাম আজ আর অ্যাপ্লিকেশানটা জমা দেয়া হবেনা। মন খারাপ হয়ে গেল, যদিও আগেই মনে হচ্ছিল কাজটা এতো সহজে হবেনা। সেমিস্টারের মাঝে ক্লাস মিস দিয়ে এভাবে বারবার এম্ব্যাসিতে যাওয়া-আসা করা খুবই বিরক্তিকর, তবুও যে কোনকিছু অর্জনের ক্ষেত্রেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কষ্ট করতে হয়, এটাই নিয়ম।
ভদ্রমহিলা একটা চেকলিস্ট বের করে টিকমার্ক দিলেন কিছু পয়েন্টে, আর বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বললেন এই তিনটি ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে আরও কিছু তথ্য লাগবে এবং নতুন আরও একটি ডকুমেন্ট লাগবে। এরপর আমার এক বান্ডিল ডকুমেন্ট ফেরত দিলেন এবং সেই সাথে চেকলিস্টটা... কাউন্টার থেকে ফেরার সাথে সাথেই পাশে থাকা জার্মান বৃদ্ধ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,
-কি খবর? অ্যাপ্লিকেশান নেয়নি?
-নাহ!
ভদ্রলোককে দেখেছিলাম কিছুক্ষণ আগেই, আমার পরেই এসেছেন, বয়স ৬০-৭০ এর মত হবে, লম্বাটে চেহারা, সোনালী চুল, চামড়ায় বয়সের ভাঁজ, খুবই হ্যাংলা-পাতলা, খুবই সাধারণ একটি শার্ট, হাফপ্যান্ট এবং স্যান্ডেল পড়া। হাফপ্যান্ট এবং স্যান্ডেল দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ ওরা এভাবেই সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ায়। ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন,
-এতোগুলো ডকুমেন্টস দিলে তারপরও নিলোনা?
-নাহ...
-হুম, দিন দিন সবকিছু কেমন যেন খুব কঠিন করে ফেলছে ওরা…
-হ্যাঁ।
-তুমি কি কাজে যাচ্ছ জার্মানীতে?
-ইন্টার্নশিপ করতে।
-কোথায়?
-হ্যানোভার এ।
-হ্যানোভারের কোথায়?
-'ইউনিভার্সিটি অফ হ্যানোভার' এর 'ইন্সটিটিউট অফ টার্বোমেশিনারী অ্যান্ড ফ্লুয়িড ডাইন্যামিক্স' এ...
ভদ্রলোক ইন্সটিটিউটের নামটা ঠিকমত বুঝতে পারলেননা, আবার জিজ্ঞেস করলেন। ইন্সটিটিউট থেকে আসা ইনভাইটেশান লেটার টা দেখালাম, জার্মানে লেখা ইন্সটিটিউটের নামটি পড়লেন এভাবে- 'ইন্সটিটুট ফুর টার্বোম্যাশিনেন অন্দ ফ্লুইদ দাইন্যামিক', পড়েই বলে উঠলেন "ওওও"…
-অ্যাপ্লিকেশান না নেয়ার কারণ কি বলেছে?
-হ্যাঁ, এই তিন মাসের জন্য আমার ভার্সিটি থেকে যে ইন্স্যুরেন্স ইস্যু করা হয়েছে সেটা যথেষ্ট না, অন্য একটা ইন্স্যুরেন্সের কথা বললো ওরা, সেটা নিতে হবে। ঐখানে গিয়ে ভার্সিটির অ্যাকোমোডেশানে থাকব সেটারও একটা লেটার লাগবে, আর ইন্টার্নশিপের ব্যাপারে প্রফেসরের সাথে যেসব ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছে সেগুলোও দিতে হবে।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-খুব কঠিন করে ফেলেছে সিস্টেম!
-আপনি মালয়েশিয়াতে...? ঘুরতে এসেছেন?
-ইন্দোনেশিয়া যাচ্ছিলাম, ফ্লাইট মিস করায় সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েকদিন ঘুরেই যাই।
-ওহ আচ্ছা। ভালই তো, এই ফাঁকে মালয়েশিয়া একটু ঘুরে দেখতে পারবেন।
-কিন্তু এয়ারপোর্টে একটা ঝামেলা হয়েছে, তাই খুব মেজাজ খারাপ হয়ে আছে ওদের উপর, এই দেশটার উপরই বিরক্ত হয়ে গিয়েছি!
-ওহ আচ্ছা।
এই দেশে আবার এয়ারপোর্টে কি ধরনের ঝামেলা হতে পারে বুঝলামনা, জিজ্ঞেস করব ভেবেও আর জিজ্ঞেস করলামনা, ভাবলাম তার বাড়ি কোথায়, কোন শহরে তা জেনে নেই…
-জার্মানীর কোথায় আপনার বাড়ি?
-দক্ষিণে।
জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম কোন শহরে, তার আগেই জিজ্ঞেস করলেন,
-তুমি যেন কোথায় যাচ্ছ?
-হ্যানোভার।
-ওহ আচ্ছা, ওটা তো বহুদূর, সর্বউত্তরে।
-হ্যাঁ।
-তো আপনি কোন শহরে থাকেন তা তো বললেননা...
-আমি আসলে জার্মানীতে থাকিনা, ইন্ডিয়ায় থাকি।
কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-ইন্ডিয়া? ইন্ডিয়ার কোথায়? আমি তো বাংলাদেশী।
বাংলাদেশী শুনে ভদ্রলোক কিছুটা অবাক হলেন, খুশিও হলেন। বললেন,
-আমি থাকি তামিল নাডুতে। সাত বছর হল সেখানে আছি।
বেশ অবাক হলাম, সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-তাই? ওখানে কি চাকুরী করেন?
-নাহ, চাকুরী করি না। আমি আসলে একজন আর্টিস্ট।
-আচ্ছা।
হঠাৎ তার চেহারাটা যেন হতাশায় ভরে উঠল, কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-এই দুনিয়া আর ভাল লাগেনা, সবাই টাকার পিছনে ছুটছে…
-হ্যাঁ তা তো বটেই।
-আমি একজন আর্টিস্ট। আর্টের মূল্য এখন আর নেই, সবাই টেকনোলোজির পেছনে ছুটছে, সবাই খুব যান্ত্রিক। ফেসবুক, ইন্টারনেট এসব এসে সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। মানুষ আর মানুষ নেই। মানুষ খুব সহজে সবকিছু পেতে চায়, কষ্ট করে পেতে চায়না। যা চাওয়ার সব ইন্টারনেটেই তো আছে, আমাদের মত পুরনো মানুষদের আর দাম নেই এজন্য...
দুঃখ হল কথাগুলো শুনে, তবে সত্য কথাই বলেছেন। কিছুক্ষণ পরপর যেন কানে বাজছিল ওনার কথা গুলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার কথা শুরু করলাম…
-হুমমম… আপনার শহর যেহেতু দক্ষিণে বললেন, মিউনিখে কিংবা এর আশে-পাশে কোথাও?
-নাহ মিউনিখে না, ওটা তো বিশাল বড় শহর, এমন বড় শহর আমার ভাল লাগেনা, ছোট-খাট শহর ভাল লাগে, যেখানে প্রাণ আছে। সেখানেও প্রাণ নেই এখন, তাই তো চলে এসেছি ঐ দেশ ছেড়ে। তুমি যদি রাস্তা দিয়ে হাঁট কেউ তোমাকে জিজ্ঞেসও করবেনা তুমি কেমন আছ বা কি করছ। কিন্তু তোমাদের অঞ্চলে, মানে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে অবস্থা এমন না, এখনও প্রাণ আছে সেখানে, আছে অনেক মানুষ।
তার এই কথা শুনে মনে মনে বললাম, বাংলাদেশে আর এমন তফাত কই, অবস্থা তো প্রায় একইরকম।
-হুমম...
-যাই হোক, তো তুমি কি জার্মান জানো? না জানলে তো ঐখানে গিয়ে সমস্যা হবে, সবাই তো ইংরেজী পারেনা। নাহ, এখনকার ছেলে-পেলেরা ইংরেজী পারে, আর ওরা বেশ মিশুকও, সুতরাং কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।
-হ্যাঁ।
-তোমার কি মালয়েশিয়া ভাল লাগে? এখানে তুমি কি পড়?
-হ্যাঁ ভাল লাগে...
উত্তরে বৃদ্ধ বেশ অবাক হলেন মনে হল। বেচারা এয়ারপোর্টে কি যেন ঝামেলা বাধিয়ে এই দেশের উপরেই বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন! বলে চললাম,
-হ্যাঁ মালয়েশিয়া বেশ ভালই লাগে, আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি।
-ওহ আচ্ছা। বেশ ভাল।
-তো ওদেশে গিয়ে তো অনেক খরচ, এ ব্যাপারটা খেয়াল রেখ। তোমাদের দেশে কিংবা ইন্ডিয়াতে তো এতো খরচ না, খুবই কম।
-হ্যাঁ সত্যিই তাই।
এদিকে আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেল, ভদ্রলোকের নাম জিজ্ঞেস করলাম...
-রিচার্ড।
-আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটা কি পাওয়া যাবে?
-হ্যাঁ অবশ্যই!
সাথে সাথে একটা কাগজে লিখে দিলেন, হাতের লেখা খুব একটা পরিষ্কার না! হাসিমুখে বললেন,
-যেকোন ধরনের প্রয়োজনে আমাকে ইমেইল করবে।
-হ্যাঁ অবশ্যই। আপনি আবার জার্মানী যাবেন কবে?
-ঠিক জানিনা কবে যাব, তবে দুই-তিন মাস পরেই যেতে হবে কারণ আমি গ্রীষ্মের সময় ওখানে চাকুরী করি, এই সময়ে যা রোজগার করতে পারি তা দিয়েই সারা বছর চলি। বাকি সময়টা ইন্ডিয়াতে থাকি, আর কিছু দেশ ঘুরে বেড়াই। এই যেমন এবার ঘুরতে যাচ্ছিলাম ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন্স, আর সময় পেলে থাইল্যান্ডে যাবারও ইচ্ছে আছে।
এভাবেই শেষ হল কথোপকথন, আমিও বের হয়ে এলাম এম্ব্যাসী থেকে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করছিলাম রিচার্ডের কথা, রিচার্ডের জীবন, জীবিকা, ধর্ম, চিন্তাধারা ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই। বেচারার মনে হয় কোন পরিবারও নেই, এই বুড়ো বয়সেও একা একা, গ্রীষ্মের কয়েক মাস চাকুরী করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে বছরের বাকি সময় কাটাতে হয়। ইন্ডিয়াতে থাকার মনে হয় এটাও আরেকটা কারণ, কারণ খরচ কম। তার আরেকটা চিন্তাধারা আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে আর তা হল, প্রযুক্তির এই যুগের প্রতি উদাসীনতা, বুঝতে পারা যে এই দুনিয়ায় আসলেই ভাল লাগার বা ভাল থাকার কোন উপায় নেই, টাকার পিছনে ছুটে সবাই যেন সুখটাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে তার এই লাইন দু'টো আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল বারবারঃ কিন্তু তোমাদের অঞ্চলে, মানে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে অবস্থা এমন না, এখনও প্রাণ আছে সেখানে, আছে অনেক মানুষ এবং তোমাদের দেশে কিংবা ইন্ডিয়াতে তো এতো খরচ না, খুবই কম। আজ খুব বেশি মনে পড়ছে রিচার্ডের সাথে সেদিনের কথোপকথনটা। হ্যাঁ রিচার্ড, সত্যিই আমার দেশে এখনও অনেক প্রাণ আছে, আছে অনেক মানুষ। পুরনো ঢাকায় জন্ম এবং বড় হওয়ায় অনেক মানুষ, অনেক প্রাণ, প্রাণের কোলাহল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে বটে, যা আমি সবসময় খুঁজে বেড়াই এই দূরদেশে। বিশেষ করে ছুটির দিনে ভার্সিটি ক্যাম্পাসটা যখন জনশূণ্য হয়ে পড়ে, তখন অনুভব করতে পারি আসলে চারদিকে যত বেশী মানুষ তত বেশি ভাল, তত বেশি প্রাণের কোলাহল। এখন রিচার্ডের সাথে দেখা হলে বলতাম, হয়তো সুখের খোঁজেই পৃথিবীর ঐ প্রান্ত থেকে এই প্রান্তে চলে এসেছ, কিন্তু আসলেই কি এই অঞ্চলের মানুষও সুখে আছে? যে দেশের মানুষ এখন জানেইনা যে সে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবে নাকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর আগুনে জীবন্ত পুড়ে কিংবা মাথার উপর ওভারব্রীজ ভেঙ্গে কিংবা নয়তলা বিল্ডিং ভেঙ্গে কিংবা পুলিশের গুলিতে কিংবা …… হাহাহা, হাস্যকর আমাদের জীবন, বেঁচে থাকা হাস্যকর। গতকাল রাতে ক্যান্টিনে খাওয়ার সময় এক বড় ভাই বলছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে আমার দেশের মানুষ। স্বাভাবিক মৃত্যুও আসলে মানুষের একটা অধিকার। সত্যিই তাই…
*****
সেদিন এম্ব্যাসি থেকে ফিরেই রিচার্ডকে ইমেইল করেছিলাম। ক'দিন পর যখন রিপ্লাই পেলাম, রিচার্ড তখন ইন্দোয়ানেশিয়ার জাভা দ্বীপপুঞ্জে। জুনের দিকে জার্মানীতে আবহাওয়া কেমন থাকবে, সাথে কি কি নিয়ে যাওয়া উচিত ইত্যাদি ব্যাপারে বেশকিছু ইমেইল চালাচালি হলো। জাভার মানুষগুলো নাকি বেশ ভাল, খাবারও বেশ পছন্দ হয়েছে তার, কিন্তু ইংরেজীতে তারা তেমন ভাল কথা বলতে পারেনা বলে কিছুটা মনও খারাপ তার, মানুষগুলোর সাথে সেরকম খাতির করতে পারেনি ভাষার দূরত্বের কারণে। চিন্তা করি, করে অবাক হই, আল্লাহ কত বর্ণের কত গোত্রের কত ভাষাভাষির মানুষ সৃষ্টি করেছেন; কত মত, কত চিন্তাধারার, কত ধরনের মানুষ! বাইরে পড়তে এসে কিছুটা হলেও এই নিদর্শনটা দেখার সুযোগ হয়েছে আমার আলহামদুলিল্লাহ। নিদর্শনগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেনঃ
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ
"And among His Signs is the creation of the heavens and the earth, and the variations in your languages and your colors: verily in that are Signs for those who know." (Ar-Room 30:22)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
"O mankind! We have created you from a male and a female, and made you into nations and tribes, that you may know one another." (Al-Hujuraat 49:13)সত্যিই এগুলো নিদর্শন আমাদের জন্য, মূলত বুদ্ধিমানদের জন্য। সারাবিশ্ব ঘুরে বেড়াতে চাই, নজরুলের মত বিশ্বজগৎ আপন হাতের মুঠোয় পুরে দেখতে চাই। দেখতে চাই মানুষ, হতে চাই তাদের বন্ধু, একসাথে গড়তে চাই সুন্দর আগামী।
রিচার্ডের কথা এবং কাজগুলো মাথা থেকে দূর করতে পারছিনা, কেন সে তার নিজের দেশ ছেড়ে বহুদূরের এক অজানা দেশকে নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছে? যদিও সে বলেছে প্রাণের স্পন্দনের খোঁজেই সে ছেড়েছে নিজের দেশ। সেইসাথে আর্টিস্ট হওয়ার কারণে প্রযুক্তির কাছে এখন তার আর্টের আর কোন মূল্য না থাকাটাও আরেকটা কারণ। কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে 'নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস' এর মতই ঠেকছে। হয়তো তামিল নাডুর অবস্থা বাংলাদেশের মত না, বাংলাদেশে এলে হয়তো রিচার্ড বুঝত প্রাণের স্পন্দনের মাঝেও আছে কত ধরনের বাধা-বিপত্তি। ঐ যে বললাম, যে দেশের মানুষ জানেনা কখন মাথার উপর কি ভেঙ্গে গিয়ে তার মৃত্যু হয়, আর মন্ত্রী-আমলাগণ এই ব্যাপার নিয়েও তামাশা করেন আজগুবি সব মন্তব্য করার মাধ্যমে। এতোসব ঝামেলাই আসলে প্রমাণ করে যে দু' দিনের এই দুনিয়াটা আসলেই অর্থহীন। রিচার্ডের কথাই ধরি, তার জীবনটা যেমন অথই সাগরে কোন লক্ষ্য ছাড়াই এগিয়ে চলছে, কোন পরিবার নেই, ছেলে-মেয়ে নেই, বুড়ো বয়সে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন 'প্রাণ' এর সন্ধানে, 'সুখ' এর সন্ধানে। সুখ সে খুঁজে পায়নি তা বলবোনা, হতে পারে সে আমার চাইতেও বেশি সুখী।
*****
আমার দেশটা এখন আর ভাল নেই, দেশের মানুষ সুখে নেই, তাদের দুশ্চিন্তারও শেষ নেই, আর দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাগলের আজগুবি সব তত্ত্ব প্রদানও থেমে নেই। চিন্তা করছিলাম মালয়েশিয়ার কথা। আগামীকাল নির্বাচন, সারাদেশে নির্বাচনের আমেজ, কিন্তু ভার্সিটির ভিতরে তার লেশটুকুও নেই, বুঝার কোন উপায়ও নেই যে বাইরে এতোকিছু হয়ে যাচ্ছে। এটাই মনে হয় একটা 'বিবেকবান' দেশের/জাতির নমুনা! চিন্তা করছি বাংলাদেশ হলে কি হত!
মালয়েশিয়ার দুই কিংবদন্তী নেতা আনোয়ার ইব্রাহীম এবং মাহাথির মোহাম্মাদকে নিয়ে এ দু'টো লেখা বেশ ভাল লেগেছে, সবাই পড়তে পারেন। এদেশে যে দলই এদেশে ক্ষমতায় আসুকনা কেন, দেশ উন্নয়নের দিকেই যাবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর আমার দেশের ক্ষেত্রে বরং এর উল্টো, যে দেশই আসুকনা কেন, দেশের যে উন্নয়ন হবেনা এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বরই হাস্যকর, দুঃখজনকও বটে, আমরা নিজেরাই এর জন্য দায়ী, কারণঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
"Verily, Allah does not change the condition of the people, until they change what is in themselves." (Ar-Ra'd 13:11)তবুও দেশের মানুষগুলো থেমে নেই, বেঁচে থাকার তাগিদে ধৈর্য্য ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এই আয়াতই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাঃ
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
"And certainly, We shall test you with something of fear, hunger, loss of wealth, lives and fruits, but give glad tidings to As-Sabirin (the patient ones)." (Al-Baqara 2:155)ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ শেষে এখন ফিলিপাইন্সের পথে আছে রিচার্ড। এরপর হয়তো ফিরবে নিজ দেশে, গ্রীষ্মের ক'টি মাস টাকা রোজগার করে আবার ফিরবে ইন্ডিয়াতে 'সুখের সন্ধানে', ভাবছি রিচার্ডকে একবার দাওয়াত দিব আমার দেশটা ঘুরে যাওয়ার জন্য...
http://www.bdtoday.net/blog/blogdetail/detail/1664/tariq/14412
. . . .






