রবিবার, ৫ মে, ২০১৩

সুখের খোঁজে জার্মান বন্ধু রিচার্ড এবং আমার বাংলাদেশ


২৭ মার্চ ২০১৩
জার্মান এম্ব্যাসী, কুয়ালালামপুর

বসে আছি ভিসা অ্যাপ্লিকেশান জমা দেয়ার অফিসে, আধঘণ্টা অপেক্ষার পর আমার সিরিয়াল এলো। সাথে থাকা এক বান্ডিল(!) ডকুমেন্ট জমা দিলাম কাউন্টারে, কর্তব্যরত জার্মান ভদ্রমহিলা চোখের পলকে সবগুলো ডকুমেন্ট পড়ে বলা শুরু করলেন এই এই ডকুমেন্টগুলোর ক্ষেত্রে এই এই তথ্যগুলোও তাদের লাগবে। বুঝতে পারলাম আজ আর অ্যাপ্লিকেশানটা জমা দেয়া হবেনা। মন খারাপ হয়ে গেল, যদিও আগেই মনে হচ্ছিল কাজটা এতো সহজে হবেনা। সেমিস্টারের মাঝে ক্লাস মিস দিয়ে এভাবে বারবার এম্ব্যাসিতে যাওয়া-আসা করা খুবই বিরক্তিকর, তবুও যে কোনকিছু অর্জনের ক্ষেত্রেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কষ্ট করতে হয়, এটাই নিয়ম।

ভদ্রমহিলা একটা চেকলিস্ট বের করে টিকমার্ক দিলেন কিছু পয়েন্টে, আর বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বললেন এই তিনটি ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে আরও কিছু তথ্য লাগবে এবং নতুন আরও একটি ডকুমেন্ট লাগবে। এরপর আমার এক বান্ডিল ডকুমেন্ট ফেরত দিলেন এবং সেই সাথে চেকলিস্টটা... কাউন্টার থেকে ফেরার সাথে সাথেই পাশে থাকা জার্মান বৃদ্ধ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,
-কি খবর? অ্যাপ্লিকেশান নেয়নি?
-নাহ!

ভদ্রলোককে দেখেছিলাম কিছুক্ষণ আগেই, আমার পরেই এসেছেন, বয়স ৬০-৭০ এর মত হবে, লম্বাটে চেহারা, সোনালী চুল, চামড়ায় বয়সের ভাঁজ, খুবই হ্যাংলা-পাতলা, খুবই সাধারণ একটি শার্ট, হাফপ্যান্ট এবং স্যান্ডেল পড়া। হাফপ্যান্ট এবং স্যান্ডেল দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ ওরা এভাবেই সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ায়। ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন,
-এতোগুলো ডকুমেন্টস দিলে তারপরও নিলোনা?
-নাহ...
-হুম, দিন দিন সবকিছু কেমন যেন খুব কঠিন করে ফেলছে ওরা…
-হ্যাঁ।
-তুমি কি কাজে যাচ্ছ জার্মানীতে?
-ইন্টার্নশিপ করতে।
-কোথায়?

-হ্যানোভার এ।
-হ্যানোভারের কোথায়?
-'ইউনিভার্সিটি অফ হ্যানোভার' এর 'ইন্সটিটিউট অফ টার্বোমেশিনারী অ্যান্ড ফ্লুয়িড ডাইন্যামিক্স' এ...


ভদ্রলোক ইন্সটিটিউটের নামটা ঠিকমত বুঝতে পারলেননা, আবার জিজ্ঞেস করলেন। ইন্সটিটিউট থেকে আসা ইনভাইটেশান লেটার টা দেখালাম, জার্মানে লেখা ইন্সটিটিউটের নামটি পড়লেন এভাবে- 'ইন্সটিটুট ফুর টার্বোম্যাশিনেন অন্দ ফ্লুইদ দাইন্যামিক', পড়েই বলে উঠলেন "ওওও"…
-অ্যাপ্লিকেশান না নেয়ার কারণ কি বলেছে?
-হ্যাঁ, এই তিন মাসের জন্য আমার ভার্সিটি থেকে যে ইন্স্যুরেন্স ইস্যু করা হয়েছে সেটা যথেষ্ট না, অন্য একটা ইন্স্যুরেন্সের কথা বললো ওরা, সেটা নিতে হবে। ঐখানে গিয়ে ভার্সিটির অ্যাকোমোডেশানে থাকব সেটারও একটা লেটার লাগবে, আর ইন্টার্নশিপের ব্যাপারে প্রফেসরের সাথে যেসব ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছে সেগুলোও দিতে হবে।

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-খুব কঠিন করে ফেলেছে সিস্টেম!
-আপনি মালয়েশিয়াতে...? ঘুরতে এসেছেন?
-ইন্দোনেশিয়া যাচ্ছিলাম, ফ্লাইট মিস করায় সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েকদিন ঘুরেই যাই।
-ওহ আচ্ছা। ভালই তো, এই ফাঁকে মালয়েশিয়া একটু ঘুরে দেখতে পারবেন।
-কিন্তু এয়ারপোর্টে একটা ঝামেলা হয়েছে, তাই খুব মেজাজ খারাপ হয়ে আছে ওদের উপর, এই দেশটার উপরই বিরক্ত হয়ে গিয়েছি!
-ওহ আচ্ছা।


এই দেশে আবার এয়ারপোর্টে কি ধরনের ঝামেলা হতে পারে বুঝলামনা, জিজ্ঞেস করব ভেবেও আর জিজ্ঞেস করলামনা, ভাবলাম তার বাড়ি কোথায়, কোন শহরে তা জেনে নেই…
-জার্মানীর কোথায় আপনার বাড়ি?
-দক্ষিণে।

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম কোন শহরে, তার আগেই জিজ্ঞেস করলেন,
-তুমি যেন কোথায় যাচ্ছ?
-হ্যানোভার।
-ওহ আচ্ছা, ওটা তো বহুদূর, সর্বউত্তরে।
-হ্যাঁ।
-তো আপনি কোন শহরে থাকেন তা তো বললেননা...
-আমি আসলে জার্মানীতে থাকিনা, ইন্ডিয়ায় থাকি।

কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-ইন্ডিয়া? ইন্ডিয়ার কোথায়? আমি তো বাংলাদেশী।
বাংলাদেশী শুনে ভদ্রলোক কিছুটা অবাক হলেন, খুশিও হলেন। বললেন,
-আমি থাকি তামিল নাডুতে। সাত বছর হল সেখানে আছি।
বেশ অবাক হলাম, সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-তাই? ওখানে কি চাকুরী করেন?
-নাহ, চাকুরী করি না। আমি আসলে একজন আর্টিস্ট।
-আচ্ছা।


হঠাৎ তার চেহারাটা যেন হতাশায় ভরে উঠল, কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-এই দুনিয়া আর ভাল লাগেনা, সবাই টাকার পিছনে ছুটছে…
-হ্যাঁ তা তো বটেই।
-আমি একজন আর্টিস্ট। আর্টের মূল্য এখন আর নেই, সবাই টেকনোলোজির পেছনে ছুটছে, সবাই খুব যান্ত্রিক। ফেসবুক, ইন্টারনেট এসব এসে সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। মানুষ আর মানুষ নেই। মানুষ খুব সহজে সবকিছু পেতে চায়, কষ্ট করে পেতে চায়না। যা চাওয়ার সব ইন্টারনেটেই তো আছে, আমাদের মত পুরনো মানুষদের আর দাম নেই এজন্য...

দুঃখ হল কথাগুলো শুনে, তবে সত্য কথাই বলেছেন। কিছুক্ষণ পরপর যেন কানে বাজছিল ওনার কথা গুলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার কথা শুরু করলাম…
-হুমমম… আপনার শহর যেহেতু দক্ষিণে বললেন, মিউনিখে কিংবা এর আশে-পাশে কোথাও?
-নাহ মিউনিখে না, ওটা তো বিশাল বড় শহর, এমন বড় শহর আমার ভাল লাগেনা, ছোট-খাট শহর ভাল লাগে, যেখানে প্রাণ আছে। সেখানেও প্রাণ নেই এখন, তাই তো চলে এসেছি ঐ দেশ ছেড়ে। তুমি যদি রাস্তা দিয়ে হাঁট কেউ তোমাকে জিজ্ঞেসও করবেনা তুমি কেমন আছ বা কি করছ। কিন্তু তোমাদের অঞ্চলে, মানে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে অবস্থা এমন না, এখনও প্রাণ আছে সেখানে, আছে অনেক মানুষ।
তার এই কথা শুনে মনে মনে বললাম, বাংলাদেশে আর এমন তফাত কই, অবস্থা তো প্রায় একইরকম।
-হুমম...
-যাই হোক, তো তুমি কি জার্মান জানো? না জানলে তো ঐখানে গিয়ে সমস্যা হবে, সবাই তো ইংরেজী পারেনা। নাহ, এখনকার ছেলে-পেলেরা ইংরেজী পারে, আর ওরা বেশ মিশুকও, সুতরাং কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।
-হ্যাঁ।
-তোমার কি মালয়েশিয়া ভাল লাগে? এখানে তুমি কি পড়?
-হ্যাঁ ভাল লাগে...

উত্তরে বৃদ্ধ বেশ অবাক হলেন মনে হল। বেচারা এয়ারপোর্টে কি যেন ঝামেলা বাধিয়ে এই দেশের উপরেই বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন! বলে চললাম,
-হ্যাঁ মালয়েশিয়া বেশ ভালই লাগে, আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি।
-ওহ আচ্ছা। বেশ ভাল।
-তো ওদেশে গিয়ে তো অনেক খরচ, এ ব্যাপারটা খেয়াল রেখ। তোমাদের দেশে কিংবা ইন্ডিয়াতে তো এতো খরচ না, খুবই কম।
-হ্যাঁ সত্যিই তাই।

এদিকে আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেল, ভদ্রলোকের নাম জিজ্ঞেস করলাম...
-রিচার্ড।
-আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটা কি পাওয়া যাবে?
-হ্যাঁ অবশ্যই!

সাথে সাথে একটা কাগজে লিখে দিলেন, হাতের লেখা খুব একটা পরিষ্কার না! হাসিমুখে বললেন,
-যেকোন ধরনের প্রয়োজনে আমাকে ইমেইল করবে।
-হ্যাঁ অবশ্যই। আপনি আবার জার্মানী যাবেন কবে?
-ঠিক জানিনা কবে যাব, তবে দুই-তিন মাস পরেই যেতে হবে কারণ আমি গ্রীষ্মের সময় ওখানে চাকুরী করি, এই সময়ে যা রোজগার করতে পারি তা দিয়েই সারা বছর চলি। বাকি সময়টা ইন্ডিয়াতে থাকি, আর কিছু দেশ ঘুরে বেড়াই। এই যেমন এবার ঘুরতে যাচ্ছিলাম ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন্স, আর সময় পেলে থাইল্যান্ডে যাবারও ইচ্ছে আছে।


এভাবেই শেষ হল কথোপকথন, আমিও বের হয়ে এলাম এম্ব্যাসী থেকে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করছিলাম রিচার্ডের কথা, রিচার্ডের জীবন, জীবিকা, ধর্ম, চিন্তাধারা ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই। বেচারার মনে হয় কোন পরিবারও নেই, এই বুড়ো বয়সেও একা একা, গ্রীষ্মের কয়েক মাস চাকুরী করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে বছরের বাকি সময় কাটাতে হয়। ইন্ডিয়াতে থাকার মনে হয় এটাও আরেকটা কারণ, কারণ খরচ কম। তার আরেকটা চিন্তাধারা আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে আর তা হল, প্রযুক্তির এই যুগের প্রতি উদাসীনতা, বুঝতে পারা যে এই দুনিয়ায় আসলেই ভাল লাগার বা ভাল থাকার কোন উপায় নেই, টাকার পিছনে ছুটে সবাই যেন সুখটাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে তার এই লাইন দু'টো আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল বারবারঃ কিন্তু তোমাদের অঞ্চলে, মানে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে অবস্থা এমন না, এখনও প্রাণ আছে সেখানে, আছে অনেক মানুষ এবং তোমাদের দেশে কিংবা ইন্ডিয়াতে তো এতো খরচ না, খুবই কম। আজ খুব বেশি মনে পড়ছে রিচার্ডের সাথে সেদিনের কথোপকথনটা। হ্যাঁ রিচার্ড, সত্যিই আমার দেশে এখনও অনেক প্রাণ আছে, আছে অনেক মানুষ। পুরনো ঢাকায় জন্ম এবং বড় হওয়ায় অনেক মানুষ, অনেক প্রাণ, প্রাণের কোলাহল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে বটে, যা আমি সবসময় খুঁজে বেড়াই এই দূরদেশে। বিশেষ করে ছুটির দিনে ভার্সিটি ক্যাম্পাসটা যখন জনশূণ্য হয়ে পড়ে, তখন অনুভব করতে পারি আসলে চারদিকে যত বেশী মানুষ তত বেশি ভাল, তত বেশি প্রাণের কোলাহল। এখন রিচার্ডের সাথে দেখা হলে বলতাম, হয়তো সুখের খোঁজেই পৃথিবীর ঐ প্রান্ত থেকে এই প্রান্তে চলে এসেছ, কিন্তু আসলেই কি এই অঞ্চলের মানুষও সুখে আছে? যে দেশের মানুষ এখন জানেইনা যে সে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবে নাকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর আগুনে জীবন্ত পুড়ে কিংবা মাথার উপর ওভারব্রীজ ভেঙ্গে কিংবা নয়তলা বিল্ডিং ভেঙ্গে কিংবা পুলিশের গুলিতে কিংবা …… হাহাহা, হাস্যকর আমাদের জীবন, বেঁচে থাকা হাস্যকর। গতকাল রাতে ক্যান্টিনে খাওয়ার সময় এক বড় ভাই বলছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে আমার দেশের মানুষ। স্বাভাবিক মৃত্যুও আসলে মানুষের একটা অধিকার। সত্যিই তাই…

*****

সেদিন এম্ব্যাসি থেকে ফিরেই রিচার্ডকে ইমেইল করেছিলাম। ক'দিন পর যখন রিপ্লাই পেলাম, রিচার্ড তখন ইন্দোয়ানেশিয়ার জাভা দ্বীপপুঞ্জে। জুনের দিকে জার্মানীতে আবহাওয়া কেমন থাকবে, সাথে কি কি নিয়ে যাওয়া উচিত ইত্যাদি ব্যাপারে বেশকিছু ইমেইল চালাচালি হলো। জাভার মানুষগুলো নাকি বেশ ভাল, খাবারও বেশ পছন্দ হয়েছে তার, কিন্তু ইংরেজীতে তারা তেমন ভাল কথা বলতে পারেনা বলে কিছুটা মনও খারাপ তার, মানুষগুলোর সাথে সেরকম খাতির করতে পারেনি ভাষার দূরত্বের কারণে। চিন্তা করি, করে অবাক হই, আল্লাহ কত বর্ণের কত গোত্রের কত ভাষাভাষির মানুষ সৃষ্টি করেছেন; কত মত, কত চিন্তাধারার, কত ধরনের মানুষ! বাইরে পড়তে এসে কিছুটা হলেও এই নিদর্শনটা দেখার সুযোগ হয়েছে আমার আলহামদুলিল্লাহ। নিদর্শনগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেনঃ

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ
"And among His Signs is the creation of the heavens and the earth, and the variations in your languages and your colors: verily in that are Signs for those who know." (Ar-Room 30:22)

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
"O mankind! We have created you from a male and a female, and made you into nations and tribes, that you may know one another." (Al-Hujuraat 49:13)

সত্যিই এগুলো নিদর্শন আমাদের জন্য, মূলত বুদ্ধিমানদের জন্য। সারাবিশ্ব ঘুরে বেড়াতে চাই, নজরুলের মত বিশ্বজগৎ আপন হাতের মুঠোয় পুরে দেখতে চাই। দেখতে চাই মানুষ, হতে চাই তাদের বন্ধু, একসাথে গড়তে চাই সুন্দর আগামী।

রিচার্ডের কথা এবং কাজগুলো মাথা থেকে দূর করতে পারছিনা, কেন সে তার নিজের দেশ ছেড়ে বহুদূরের এক অজানা দেশকে নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছে? যদিও সে বলেছে প্রাণের স্পন্দনের খোঁজেই সে ছেড়েছে নিজের দেশ। সেইসাথে আর্টিস্ট হওয়ার কারণে প্রযুক্তির কাছে এখন তার আর্টের আর কোন মূল্য না থাকাটাও আরেকটা কারণ। কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে 'নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস' এর মতই ঠেকছে। হয়তো তামিল নাডুর অবস্থা বাংলাদেশের মত না, বাংলাদেশে এলে হয়তো রিচার্ড বুঝত প্রাণের স্পন্দনের মাঝেও আছে কত ধরনের বাধা-বিপত্তি। ঐ যে বললাম, যে দেশের মানুষ জানেনা কখন মাথার উপর কি ভেঙ্গে গিয়ে তার মৃত্যু হয়, আর মন্ত্রী-আমলাগণ এই ব্যাপার নিয়েও তামাশা করেন আজগুবি সব মন্তব্য করার মাধ্যমে। এতোসব ঝামেলাই আসলে প্রমাণ করে যে দু' দিনের এই দুনিয়াটা আসলেই অর্থহীন। রিচার্ডের কথাই ধরি, তার জীবনটা যেমন অথই সাগরে কোন লক্ষ্য ছাড়াই এগিয়ে চলছে, কোন পরিবার নেই, ছেলে-মেয়ে নেই, বুড়ো বয়সে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন 'প্রাণ' এর সন্ধানে, 'সুখ' এর সন্ধানে। সুখ সে খুঁজে পায়নি তা বলবোনা, হতে পারে সে আমার চাইতেও বেশি সুখী।

*****

আমার দেশটা এখন আর ভাল নেই, দেশের মানুষ সুখে নেই, তাদের দুশ্চিন্তারও শেষ নেই, আর দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাগলের আজগুবি সব তত্ত্ব প্রদানও থেমে নেই। চিন্তা করছিলাম মালয়েশিয়ার কথা। আগামীকাল নির্বাচন, সারাদেশে নির্বাচনের আমেজ, কিন্তু ভার্সিটির ভিতরে তার লেশটুকুও নেই, বুঝার কোন উপায়ও নেই যে বাইরে এতোকিছু হয়ে যাচ্ছে। এটাই মনে হয় একটা 'বিবেকবান' দেশের/জাতির নমুনা! চিন্তা করছি বাংলাদেশ হলে কি হত!

মালয়েশিয়ার দুই কিংবদন্তী নেতা আনোয়ার ইব্রাহীম এবং মাহাথির মোহাম্মাদকে নিয়ে এ দু'টো লেখা বেশ ভাল লেগেছে, সবাই পড়তে পারেন। এদেশে যে দলই এদেশে ক্ষমতায় আসুকনা কেন, দেশ উন্নয়নের দিকেই যাবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর আমার দেশের ক্ষেত্রে বরং এর উল্টো, যে দেশই আসুকনা কেন, দেশের যে উন্নয়ন হবেনা এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।  বরই হাস্যকর, দুঃখজনকও বটে, আমরা নিজেরাই এর জন্য দায়ী, কারণঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
"Verily, Allah does not change the condition of the people, until they change what is in themselves." (Ar-Ra'd 13:11)
তবুও দেশের মানুষগুলো থেমে নেই, বেঁচে থাকার তাগিদে ধৈর্য্য ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এই আয়াতই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাঃ
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
"And certainly, We shall test you with something of fear, hunger, loss of wealth, lives and fruits, but give glad tidings to As-Sabirin (the patient ones)." (Al-Baqara 2:155)

ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ শেষে এখন ফিলিপাইন্সের পথে আছে রিচার্ড। এরপর হয়তো ফিরবে নিজ দেশে, গ্রীষ্মের ক'টি মাস টাকা রোজগার করে আবার ফিরবে ইন্ডিয়াতে 'সুখের সন্ধানে', ভাবছি রিচার্ডকে একবার দাওয়াত দিব আমার দেশটা ঘুরে যাওয়ার জন্য...


http://www.bdtoday.net/blog/blogdetail/detail/1664/tariq/14412



. . . .

রবিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১২

রোজার ঈদ এবং এক প্রফেসরের সাদাসিধে গপ্পো . . .

অগাস্ট ২০১০, রোজার ঈদের বন্ধ চলছে। এই দূরদেশে ঈদের আনন্দ দেশের মত না হলেও, মন্দ না। ঈদের দিন স্যারদের এবং বড় ভাইদের বাসায় যাওয়া, ভার্সিটির কিছু প্রোগ্রাম, সবকিছু মিলিয়ে ভালই কাটে। কিন্তু দিনশেষে কিন্তু দেশের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হবেই, যা খুবই স্বাভাবিক। তবে যারা বহুদিন ধরে বিদেশে আছেন তাদের জন্য ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, বেশি কষ্ট হয় নতুন চিড়িয়াদের!

ঈদের পরদিন গিয়েছিলাম মালাক্কা, মালয়েশিয়ার বন্দর নগরী এবং ঐতিহাসিক শহর। মালাক্কা ভ্রমণের পর বিশ্রাম নিলাম দু'দিন, কিন্তু বন্ধের আরো সাত সাতটা দিন বাকি, কিছুতেই সময় কাটছিলনা… ভাবছিলাম কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি, কিন্তু ভাবছিলাম যাব কোথায়?? ভাবতে না ভাবতেই শফিক ভাই টোকা দিলেন জিমেইলে, "চলে আস আমার বাসায়"। খুশিতে ভরে উঠল মনটা, ভাইয়ার বাসায় যাব যাব করেও যাওয়া হয়ে উঠেনি। ভাইয়া পিএইচডি করছেন ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া তে সংক্ষেপে UPM, বলা যায় ইউনিভার্সিটি মালায়া এর পর এটাই মালয়েশিয়ার সবচেয়ে ভাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। ভাইয়ার পিএইচডি তখন প্রায় শেষের দিকে, বর্তমানে মালয়েশিয়ার আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে আছেন। তারপরদিনই চলে গেলাম সারদাং এ অবস্থিত ভাইয়ার ক্যাম্পাস এ, ভাইয়ার বাসাও ক্যাম্পাস থেকে খুব কাছেই। যাতায়াতও তেমন একটা কঠিন না, সরাসরি ট্রেনে করেই যাওয়া যায়, তবে একবার ট্রেন চেঞ্জ করতে হয়।

ভাইয়ার সাথে দেখা হলো বিকেলে, একসাথে চা-নাস্তা করে পার্কে গেলাম, UPM এর অন্যান্য বাংলাদেশী ভাইয়ার সাথেও পরিচয় হলো। ইতিমধ্যেই আযান দিল মাগরিবের, UPM এর বিশাল মসজিদটা পার্ক থেকেই দেখা যাচ্ছে…

সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১১

আমার বিদেশী বন্ধুরা (৩য় পর্বঃ ইয়াসিন - সুদান)

[২০১০-১১ সেশনের শর্ট সেমিস্টারে International Students' Division (ISD) এর Welcoming Committee তে কাজ করতে গিয়েই ইয়াসিনের সাথে পরিচয়। এই সেমিস্টারের নতুন ছাত্র ছিল সে, বলা যায় আমার জুনিয়র ফ্রেন্ড। Welcoming Committee হচ্ছে ISD এর অধীনে একটি স্টুডেন্ট গ্রুপ। এই গ্রুপের কাজ মূলতঃ সারাবিশ্ব থেকে আগত নতুন ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র-ছাত্রীদের এয়ারপোর্ট থেকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসা, তাদের রেজিস্ট্রেশানের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা, এবং তাদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা। ইয়াসিন এবং তার পরিবারের এক সদস্যের সাথে পরিচয় এবং পরবর্তীতে বেশ কিছু স্মরণীয় মূহুর্তগুলো শেয়ার করার এই ক্ষুদ্রে প্রচেষ্টা...]

আসরের নামাজের মধ্যে মোবাইল কাঁপা শুরু করলো… মেজাজটা যেমন গরম হয়ে গেলো, খুব খারাপও লাগছিল ইয়াসিনের জন্য। প্রায় আধা ঘণ্টা মেইন গেটে দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াসিনের জন্য অপেক্ষা করা সত্ত্বেও ওর দেখা না পেয়ে যেইনা মাত্র মসজিদে গিয়ে নামাযে দাঁড়ালাম, তখনই এলো ওর কল্‌! রিয়াদ টু কুয়ালালামপুর প্রায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আবার এক ঘণ্টা KLIA (Kuala Lumpur International Airport) টু IIUM ট্যাক্সি ভ্রমণ করে আসা একজন ক্লান্ত মানুষ আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে অথচ আমি… তখন অবশ্য ইয়াসিনের সাথে পরিচয় ছিলনা আমার, শুধুমাত্র জানি যে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রিয়াদ থেকে কুয়ালালামপুর আসছে সুদানিজ ছেলে ইয়াসিন, KLIA তে ল্যান্ড করবে দুপুর ৩টায়, আর IIUM পৌঁছুতে বিকাল ৫টার মতো বাজবে। ঘণ্টাখানেক আগে এয়ারপোর্ট থেকে মারুফ মোহাম্মাদ ভাই এসএমএস করে জানালেন ইয়াসিনকে তিনি ইতিমধ্যে "এয়ারপোর্ট লিমুজিন"-এ তুলে দিয়েছেন। এয়ারপোর্ট লিমুজিন হলো KLIA এর বিশেষ ট্যাক্সি সার্ভিস, সবচাইতে নিরাপদ। মালয়েশিয়ার হিংস্র তামিল ট্যাক্সি ড্রাইভারদের থাবা থেকে বাঁচানোর জন্যই মনে হয় KLIA কর্তৃপক্ষের এই মহান উদ্যোগ!

নামায শেষ হতেই মসজিদের অ্যাডমিন বিল্ডিং এর সামনের গেট থেকে বের হতে হতে ফোন দিলাম ইয়াসিনকে, ততক্ষণে প্রায় ৫-৬ মিনিট দেরী হয়ে গিয়েছে। কল রিসিভ করলো ওপাশ থেকে ইয়াসিন...

সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০১১

দ্যাশডা joker এ ভইরা গ্যাছে দেহি!!!

লেখার যে শিরোনামটা দেখছেন, এটা হলো ৮ অগাস্ট ২০১১ সনে দেয়া আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস। আমার ভার্সিটির এক আপু এই স্ট্যাটাসের হেতু জিজ্ঞেস করিলেন, উত্তরে বলিলাম, "হাহাহাহাহা!! শ্যামলী থেইক্কা ৭ নাম্বার বাসে কইরা বাসায় ফিরতাছিলাম, দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার যাত্রায় এমন সব joker কে দেখলাম, যেসব joker এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় শুধুমাত্র আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশেই!!!! :D" স্বভাবতই কৌতূহল জাগার মতোই উত্তর। আপু পুনারায় জিজ্ঞাসা করিলেন, "একটু বৃত্তান্ত দাও আমি না দেইখা মজা লই :P". বৃত্তান্ত শুরু করিয়াছিলাম, কিন্তু দেখিলাম কতক লাইনের কমেন্টের মাধ্যমে এই joker-বৃন্দের এবং তাদের কার্যকলাপের কাহিনী বর্ণনা করা সম্ভবপর নহে, কারণ এই joker-দিগের joke এর মান সত্যিই বেশ উঁচুমানের এবং superior! :D তাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলাম পুরো ঘটনা লিখিয়া ফেলিনা কেন? বহুদিন তো লেখা হয়না, লেখার খড়াটাও একটু কাটিবে এই সুযোগে, যেই ভাবনা সেই কাজ, আপুকে বলিয়া দিলাম বৃত্তান্ত আমি দিচ্ছি, তবে কমেন্টে না, একটা ব্লগপোস্টের মাধ্যমেই। ;)
আমার লেখার হাত কখনোই ভাল ছিলোনা, স্বাভাবিকভাবেই এ লেখাটিও পূর্ববর্তী লেখাসমূহের ধারা বজায় রাখিয়াছে। আমরা জানি ভাষায় সাধু-চলিতের মিশ্রণ দূষনীয়, কিন্তু পাঠকবৃন্দ, আমি বেশ বেরসিক মানুষ, এই নিয়ম আমার ভালা লাগেনা, য্যামনে ভালা লাগে হ্যামনেই লেখি, তাই লেখার মইধ্যে দেখিবেন সাধু-চলিতের সাথে বিভিন্ন আঞ্চলিক/উদ্ভট বাংলার উপস্থিতি, হয়তো এক লাইনের মধ্যেই খুঁজে পাবেন বেশ ক' ধরনের বাংলা! মাইন্ড খাইয়েননা আবার! আশা করি বুইঝতে পারিছেন। :D

*  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * *  *  *  *  *  * * 
দীর্ঘ ৮ মাস পর দেশে ফিরেছিলাম সেমিস্টার ব্রেক পেয়ে, এর আগেও এসেছিলাম ৩ বার, কিন্তু তখন

সোমবার, ৯ মে, ২০১১

আমার বিদেশী বন্ধুরা (২য় পর্বঃ আহমাদ ইয়েমেনী)


আমার মোবাইলের কন্টাক্ট লিস্টে ওর নাম এভাবেই লেখা আছেঃ Ahmad Yemeni, আরেক বন্ধু Ahmad afghani-র সাথে ওকে পার্থক্য করার জন্যই এভাবে লেখা। কারণ এখানে এত্তো বেশি "আহ্‌মাদ" যে, দেশের নাম পাশে না লিখে রাখলে কোনটা কার নাম্বার তা মনে রাখা কঠিন হয়ে যায়। মাঝে মাঝে দেশের নাম রাখলেও হয়না, কারণ একই দেশের একই নামের বন্ধুও আছে। সেক্ষেত্রে তাদের দেশের নামের সাথে সাথে ডিপার্টমেন্টের সংক্ষিপ্ত নাম এবং বর্ষ লিখে রাখতে হয়, যেমনঃ 'Khalid Econ', 'Khalid Law', 'Khalid Thailand Engin', 'Khalid bhai Masters' ইত্যাদি ইত্যাদি। বিদেশী বন্ধুদের নিয়ে কিছু লেখার, হালকা-পাতলা গপ্পো করতে বেশ ভালো লাগে আমার, আর এটা আমার শখও বলতে পারেন। প্রথমে আহমাদ ইয়েমেনীর গল্পই শুরু করা যাক।

২০০৯ এর জুলাই কি অগাস্ট মাস, একদিন, ব্যাসিক কম্পিউটার স্কিল্‌স ক্লাসে আমার পাশে বসা আহমাদ হঠাৎ করে চিৎকার করে

রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১০

“বিদেশ আইসা লস্ হয়া গেছে ভাই, তয় একটা জিনিস আমার চোখ খুইলা দিছে”

বসে ছিলাম লাইব্রেরীর সামনে, রিসার্চ & ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এর পাশের এক বেঞ্চিতে। সবাই বলে এখানেই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াই-ফাই এর সবচাইতে ভালো সিগনাল পাওয়া যায়। লাইব্রেরী খুলবে সকাল ৮টায়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আরো ১৫ মিনিট বাকি। এই ফাঁকে মেইলগুলো চেক করে ফেলা যাক, ল্যাপ্পি বের করে জিমেইলে লগিন করতে না করতেই দেখলাম বেশ দূরে এক বাংলাদেশী ভাই নাসির হেঁটে যাচ্ছেন, তবে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন, স্টাফ। চোখাচোখি হতেই দূর থেকে হাত নাড়িয়ে সালাম দিলাম। কিন্তু একটা মজার ব্যাপার হলো, 'আসসালামু আলাইকুম' না বলে শুধু হাত নাড়ালেই কি সালাম দেয়া হয়ে যায়? এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর যে সংস্কৃতিটা আমার সবচাইতে ভালো লেগেছিলো তা হলো একজনের সাথে আরেকজনের দেখা-সাক্ষাৎ হলে সবাই খোঁজ-খবর নেয়, কেমন আছি-পড়ালেখা কেমন হচ্ছে-ভালো আছি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এ কাজে বিদেশী ছাত্রদেরকেই বেশী আগ্রহী দেখেছি বাংলাদেশী ছাত্রদের চাইতে। আসলে ছোটবেলা থেকেই ওদের সংস্কৃতিটা এতো অদ্ভূত সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে যে এসকল কাজকে ওরা আবশ্যকীয় কর্তব্য হিসেবেই ভাবে যা আমরা ভাবিনা। এ কারণেই হয়তো কারো সাথে বেশ দূর থেকে দেখা হলে দূর থেকে হাত নাড়িয়ে ও একই সময় মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে সালাম দেয় ওরা। এটা সবার মধ্যেই প্রচলিত এখানে। এ জন্য নিজের অজান্তেই ঘটে এখন এটা। নাসির ভাইর সাথে চোখাচোখি হতেই দু'জনেই একইভাবে সালাম দিলাম। সালাম দিয়েই আমি আবার মেইল চেকিং এ মগ্ন হয়ে পড়লাম, খেয়াল করিনি যে উনি আমার দিকেই আসছেন। জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছি-দেশে কবে যাবো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও এই সুযোগে কথা বলা শুরু করলাম……

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১০

মালাক্কা সফরের কিছু কথা এবং আমাদের বিশ্বভ্রমণ

আমার কাছে মনে হয় বিদেশে পড়ালেখা করা আর জেলখানায় বসবাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সারা সারাবরছর ধরেই ‘ক্লাস-ল্যাব-লাইব্রেরী-হোস্টেল’ হলো আমাদের জীবনচক্র এবং ‘এসাইনমেন্ট-ল্যাবরিপোর্ট-কুইজ-মিডটার্ম’ হলো আমাদের কর্মচক্র, এর সাথে মাঝে মাঝে বিভিন্ন কো-কারিকুলার এক্টিভিটিসও থাকে। ভাল ফলাফল করতে হলে এর বাইরে কোনো কিছু করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। ইচ্ছে করলে হয়তো একটু ঘুরে আসার সময় বের করা যায়, খরচের ভয়ে আর ঘুরতে যাওয়ার সাহস হয়না কারণ আমরা তো আর সৌদী আরবের ছাত্র নই যে মাসে ৫০০০ রিংগিত স্কলারশিপ পাচ্ছি। ;) আর তাছাড়া এটাতো আর আমার বাংলাদেশ না যে মন চাইলেই একটা রিকশা ডেকে কোথাও চলে গেলাম অথবা নিচের দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে এলাম! ‘Paul T Scheuring’ এর জনপ্রিয় ইংলিশ সিরিয়াল ‘Prison Break’ এ খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম জেলে বসবাসরত একজন মানুষের জীবন কেমন হতে পারে। মাঝে মাঝে নিজেকে ঠিক তেমনই মনে হয়, হতাশায় এতোটাই ডুবে যায় যে তখন ধৈর্য্য ধরার উপদেশ যারা দেন তাদেরকে জীবনের সবচাইতে বড় শত্রু মনে হয়। আর তাছাড়া বন্ধের দিনগুলো যেন আরো বিরক্তিকর।

রবিবার, ২৩ মে, ২০১০

প্রথম দেখায় কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট

এবারের সেমিস্টার ব্রেকে দেশে যাওয়া হচ্ছেনা, তাই আগে থেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলাম, কিভাবে এই ২২টা দিন পার করব?? সিনিয়র ভাইয়াদের কাছ থেকে শুনলাম এ সময়টুকু হয় সবচাইতে বোরিং, খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম ছাড়া আর কোন কাজ নেই! তাই খুঁজে ফিরছিলাম কি করা যায়? সবচাইতে ভাল উপায় হচ্ছে ভার্সিটির কো-কারিকুলার এক্টিভিটিস এ যোগ দেয়া। সেমিস্টার ব্রেকের সময় একমাত্র ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরাই ক্যাম্পাসে থাকার অনুমতি পায়, লোকাল স্টুডেন্টদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়া বাধ্যতামূলক। যোগ দিলাম ওয়েলকামিং কমিটিতে। ওয়েলকামিং কমিটি হল ISD (International Student Division) এর অধীনে একটি স্টুডেন্ট গ্রুপ। এই গ্রুপের কাজগুলো হলঃ- ১) সারাবিশ্ব থেকে আগত  নতুন ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র-ছাত্রীদের এয়ারপোর্ট থেকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসা, ২) এরপর নতুন স্টুডেন্টদের রেজিস্ট্রেশানের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা, ৩) এরপর তাদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা যেমন- Group Binding, Treasure Hunt, Grand Dinner, KL tour ইত্যাদি……

মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০১০

ফিলিস্তিনী বন্ধু ফাহাদ এবং……. Forever Palestine

আজ ক্যালকুলাস ক্লাসটি একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল, মনে হচ্ছিল কেউ একজন অনুপস্থিত… কিন্তু বুঝতে পারছিলামনা কে সে? আগামী ২৫ তারিখ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু, ক্যালকুলাস পরীক্ষা ১ এপ্রিল, আজ ছিল ক্যালকুলাসের শেষ ক্লাস। স্যার ব্রিফিং দিলেন ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নের ধরণ কেমন হবে, মান-বণ্টন কেমন হবে ইত্যাদি। খুবই চিন্তিত লাগছে পরীক্ষা নিয়ে। আবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে আজ হঠাৎ ক্লাস এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল কেন? সবাই তো উপস্থিত, কিন্তু বিশেষ কেউ নিশ্চয়ই আসেনি, নাহলে ক্লাস এমন ফাঁকা ফাঁকা কেন লাগবে… অন্যদিন নাহয় ক্লাস ফাঁকি দিল, আজকের ক্লাসটা খুবই গুরুত্ব্বপূর্ণ ছিল, এই ক্লাস ফাঁকি দেয়ার তো কোন মানে হয়না! এসব ভাবতে ভাবতেই যখন ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে HS ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিলাম, দেখা হল ফাহাদের সাথে। এবার মনে পড়ল কেন ক্লাসটা এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল আমার কাছে…….?


আমি তখন E0 বিল্ডিং এর নিচতলায়, ক্যান্টিনে যাচ্ছি।

শনিবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০১০

আমার বিদেশী বন্ধুরা..... এবং এক সৌদী বন্ধুর গল্প এবং....................


IIUM এ আসার পর যে বিষয়টা আমি সবচাইতে বেশি উপভোগ করেছি তা হল- বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন সংস্কৃতির ছাত্র-ছাত্রীর সাথে পরিচিত হওয়া। সত্যিই….. এক ভিনদেশীর সাথে পরচিতি হতে পারাটা যেন অনেক কিছু! একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম অনুভূতি। তাছাড়া অন্য দেশের ব্যাপারে, সংস্কৃতি, মানুষের ব্যাপারে অনেক কিছু জানা যায়। এখানে প্রায় ১১৭টি দেশের মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেখা করে। আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম রাশিয়ার ছাত্র-ছাত্রীদের দেখে……. আমি আগে জানতামনা যে রাশিয়াতে এত বেশি মুসলমান বাস করে। এতদূর থেকে ওরা পড়তে আসলো মালয়েশিয়াতে, বেশ বিস্মিত হয়েছিলাম আমি।

ফেলে আসা দিনগুলো...... কিছু ভাবনা, কিছু স্মৃতি, কিছু সংকল্প......... এবং স্বাগতম ২০১০




৩১ ডিসেম্বর ২০০৭, রাত ১১.৪৫ মিনিট................
মন ভাল ছিলনা। কিছুটা চিন্তিত ছিলাম হয়তো কোন একটা ব্যাপারে। বারান্দায় এলাম মুক্ত বাতাস খেতে..... গ্রিল ঘেঁষে হেলান দিয়ে দাড়ালাম। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম রিকশাগুলো। হেঁটে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম সবার গতিপথ। এক একজন মানুষের গতিপথ এক এক দিকে। পৃথিবীতে কত্তোও মানুষ!!!!

সোমবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১০

আমার ১ম দেশে ফেরার অভিজ্ঞতা......


বেশ ভাল লাগছিল, মাস পর দেশে ফিরছি পড়ালেখার উদ্দেশ্যেই আমার বিদেশ যাওয়া এবং এটাই ছিল আমার ১ম বিদেশ থেকে দেশে ফেরা প্রবাস থেকে দেশে ফেরার এই সময়টুকুতে আমার জীবনের কিছু চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছে বলা চলে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেগুলো শুনে আমার প্রচণ্ড হাসি পেয়েছে, আবার ভীষণ কষ্টও লেগেছেআমার এই অভিজ্ঞতা গুলোই প্রকাশ পেয়েছে আমার এই লেখাটিতে

বৃহষ্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

সময়ের দৌড় এবং........ দেশের বাইরে জীবনের ১ম ঈদ

দেখতে না দেখতেই কেটে গেল আড়াই মাস। মানে ৩০+৩০+১৫=৭৫ দিন!!! টেরই পেলামনা কিভাবে এতদিন হয়ে গেল??? আসলেই কি ৭৫ দিন হয়ে গেল? নাকি যোগের ভুল??? :-O ঐতো সেদিনই তো এলাম। স্পষ্ট চোখের সামনে ভাসছে সবকিছু। একের পর এক…….. রাতের বেলা এয়ারপোর্ট থেকে আম্মু-আব্বুকে বিদায় দিলাম, প্লেনে উঠলাম এবং তারপর এখানে এসে নামলাম একদম কাকডাকা ভোরে। এখানে এসে অপেক্ষা করছিলাম অন্যান্য বাংলাদেশী বড় ভাইয়াদের জন্য। এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে আসার কথা ছিল তাদের। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন তাদের পেলামনা, তখন বাধ্য হয়েই এক ইন্ডিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভারের মোবাইল থেকে কল করলাম ভাইয়ার কাছে। দিনটি ছিল শনিবার, ২৭জুন ২০০৯। সরকারী ছুটির দিন। তাই স্বাভাবিকভাবেই সব ছাত্রেরই স্ট্যাটাস তখন আউট অব সার্ভিস।:-D