মন ভাল ছিলনা। কিছুটা চিন্তিত ছিলাম হয়তো কোন একটা ব্যাপারে। বারান্দায় এলাম মুক্ত বাতাস খেতে..... গ্রিল ঘেঁষে হেলান দিয়ে দাড়ালাম। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম রিকশাগুলো। হেঁটে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম সবার গতিপথ। এক একজন মানুষের গতিপথ এক এক দিকে। পৃথিবীতে কত্তোও মানুষ!!!!
ভাবছিলাম কিভাবে কিভাবে ২০০৭ সালটা শেষ হয়ে গেল!!!! ডুবে গেলাম অতীতে, ১ বছর পিছনে.... ঐতো সেদিন, সেদিনই তো SSC পাশ করলাম, এরপর HSC এর ক্লাস শুরু হয়েছিল। তারিখটা জানি কত??? উমমম. ৫ অগাস্ট ২০০৬। আমরা তখন ছিলাম নতুন ছাত্র। কলেজে উঠেছি স্কুল পাশ করে, ভাবের ঠ্যালায় অনেকের পা-ই মাটিতে পড়তনা ;-) অনেকে আবার ভাব মারতে গিয়ে সিগারেট ধরে ফেলল!!! খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন, যখন দেখতাম বড় হবার স্বপ্নে কলেজ ভর্তি হওয়া একটা ছাত্র সিগারেট খাচ্ছে, তাও আবার মেয়েদের সামনে নিজেকে বাহাদুর জাহির করতে গিয়ে!!!………….. হঠাৎ চারদিকে বিকট শব্দ হওয়া শুরু হল। অতীত থেকে ফিরে এলাম বর্তমানে….. মনে হচ্ছিল যেন বোমারু বিমান থেকে সমানে গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে। অতীতে ডুবে গিয়েছিলাম বলে টের পাইনি সত্যিই কি এটা গোলাবর্ষণ হচ্ছিল? নাকি অন্য কিছু।
১ জানুয়ারী ২০০৮, রাত ১২টা……….
কিছুক্ষণ পর টের পেলাম- বোমাবর্ষণ নয়, পটকা ফাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছিল পাড়ার ছেলেপেলে। চারদিকে রংবেরঙ্গের পটকা-আতশবাজি...... এরই মধ্যে হঠাৎ আমার কাঁধে ঠাশ্ করে একটা হাত এসে পড়ল। পিছে ফিরে দেখি আব্বু এসে দাড়িয়েছেন আমার পাশে..... আব্বুর পিছে পিছে আম্মুও...... আতশবাজির আলোতে আলোকিত রাতের আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে আব্বু বলছিলেন একটি কথা। সেই কথা যেন এখনো আমার কানে বাজে...... “২০০৮। শুরু হয়ে গেল....... মনে রাখিস আব্বু, এ বছর তোর জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বছর। HSC পরীক্ষা, এরপর BUET এর ভর্তি পরীক্ষা। অনেক অনেক কাজ বাকি। ভাল করে পড়ালেখা করতে হবে এই পণ কর এখনই......” আম্মুও যথারীতি আব্বুর কথার সাথে সুর মেলিয়ে আরো কিছু যোগ করলেন। চোখের মণি সন্তানের উদ্দেশ্যে তাদের উপদেশ বাণীর যেন কোন শেষ নেই। :-D
আমার কাছে মনে হয়, সাত-সাগরের পানি হয়তো শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সন্তানের প্রতি মা-বাবার স্নেহমাখা উপদেশ এবং বকুনির রাশিমালা কখনোই শেষ হবেনা...... অদ্ভূত দু’জন মানুষ তারা.......
আমিও আব্বু-আম্মুর কথা হৃদয়ঙ্গম করে নিলাম, আব্বুর কথা অনুযায়ী পণ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কতটুকু সফল হয়েছিলাম জানিনা....... মনে হয় সেদিন পুরোপুরি সফল ছিলামনা আমি।
৫ অগাস্ট, ২০০৮, বিকেল ৩টা…. কলেজ ক্যাম্পাস………..
“হ্যালো, হ্যালো…….আম্মু! আম্মু!! আমি A+ পেয়েছি!!!”........ওপাশ থেকে তৃপ্তি সহকারে উত্তর এলো, “আলহামদুলিল্লাহ”। মনের একটা চিন্তা দূর হল। বেশ চিন্তিত ছিলাম এ নিয়ে, SSC তে A+ পেয়েও যদি HSC তে মিস হয়ে যায়, তাহলে মহা কেলেঙ্কারী হয়ে যেত....... বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি....... কিন্ত মাথায় আরেকটা চিন্তা গিজগিজ করছিল। BUET….. BUET….. BUET…. ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন BUET. বাসা BUET এর কাছেই লালবাগ কেল্লার পাশে, তাই BUET এ পড়ার ইচ্ছে ছিল প্রচণ্ডরকম........ স্বপ্ন দেখতাম বাসায় বসেই ক্লাস করতে যাচ্ছি আমি BUET এ......
২৯ নভেম্বর, ২০০৮…... ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক
খুলনা থেকে বাসে করে ঢাকা ফিরছি। KUET গিয়েছিলাম এডমিশান টেস্ট দিতে। মোটামুটি টেনশানের মধ্যেই আছি। ২০ নভেম্বর হয়ে যাওয়া BUET এডমিশান টেস্টের রেজাল্ট তখনো পাইনি। এটা আরো বিশাল চিন্তায় ফেলে রেখেছিল আমাকে। এরই মধ্যে আম্মুর ফোন.......
-কীরে? তুই কোথায় এখন???
-বাসে, ঢাকা চলে আসতেছি।
-BUET এর রেজাল্ট দিয়েছে, তুই চান্স পাসনাই।
-ওওও........
-তোর আব্বু সব নাম & সিরিয়াল নাম্বার একের পর এক চেক করে দেখছে, তোর নাম নাই। তুই কোথায় আছিস এখন? আসতে আসতে রাত হবে??
-হ্যাঁ রাত হবে....... বলেই ফোন কেটে দিলাম....... যেন এক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি একদম বোবা হয়ে গেলাম..... আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল......
৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৯..... MIST
আমি ছিলাম ওয়েটিং লিস্টে..... আমার সিরিয়াল প্রায় চলে এসেছে....... কিন্তু তারপরও নিশ্চিন্ত হতে পারছিলামনা কারণ, KUET-এ একেবারে তীরে এসে তরী ডুবে গিয়েছে আমার, MIST তেও এমন হবেনা তো?? সেদিন ছিল MIST-এ ভর্তির তারিখ। খুব আশা ভরসা নিয়ে গেলাম, মনে একটা চিন্তা ছিল যে শেষ পর্যন্ত কোথাও চান্স পাওয়া হবেনা হয়তো.... কিন্তু সে চিন্তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে ভেবে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। কিন্তু আমার ভাগ্যে অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন আল্লাহ......।
২৭ জুন ২০০৯, সকাল ৮টা…. Kuala Lumpur International Airport
“হ্যালো আম্মু, আমি নিরাপদে পোঁছিয়েছি, চিন্তার কোন কারণ নেই। ওমা একি!!! আপনি কাঁদছেন কেন??? চিন্তার কিছু নেই। কিছুক্ষণ পরেই ভার্সিটি থেকে বাস আসবে, সেই বাসে করে যাব।”
সেদিন ওয়েটিং লিস্টে থাকা এই আমার আর চান্স হয়নি MIST তে। সেদিন আমাকে ভর্তি না হয়েই চলে আসতে হয়েছিল….. KUET এর মত MIST-তেও আমার সিরিয়ালের কাছাকাছি এসেই সব সিট শেষ হয়ে যায়। এক অফিসার বলেছিলেন, সিট খালি হলে আমাকে আবার ডাকা হবে, আমি যাতে আরো বেশ কিছুদিন ওয়েট করি। ওয়েট করতে করতে আমার নাম হয়ে গিয়েছিল “মিস্টার ওয়েটিং”, কিন্তু সেই ওয়েট আজো করে যাচ্ছি, সেই অফিসার আর ডাকেননি আমায়। যদিও সেই ডাক আসলেও এখন MIST আর যাবার কোন ইচ্ছা নেই আমার........ :-D
৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৯….
“তারিককে ফোন করে বলে দাও ওর আর এই দেশে আসার কোন দরকার নাই। এদেশে মানুষ থাকেনা, সব পশু! এখনই..... এখনই ফোন কর তারিকের কাছে..... আর বলে দাও..... ও যাতে বিদেশে কোথাও সেটেল হয়ে যায় পড়ালেখার পর এবং এখন থেকে সেভাবেই নিজেকে মেন্টালি প্রিপেয়ার করে নেয়। ইচ্ছা থাকলে বিদেশ থেকেই দেশের উপকার করা যায়। দেশের সেবা করতে হলে দেশে আসা লাগেনা। বরং দেশে আসলে আমার ছেলেটাও না জানি আবার এসব পশুদের কারণে অমানুষ হয়ে যায়...... এখনই ফোন কর তারিকের কাছে, এখনই......”
তখন ছিল রোজার মাস। তা সত্ত্বেও অফিস থেকে বাসায় ফিরে, ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই এভাবেই আম্মুর কাছে কথাগুলো বলেতে বাধ্য হয়েছিলেন আব্বু। ঘটনার দিন আব্বুর প্রমোশান হবার কথা ছিল। এর প্রায় ছয় মাস আগেও প্রমোশান হবার কথা ছিল...... কিন্তু হয়নি, এবারো প্রমোশান হলনা...... কারণ একটাই, ঘুষ দেননি তিনি। শুধু এই দু’বারই নয়, আব্বুর এই প্রমোশান হবার কথা ছিল তিন অথবা চার বছর আগে....... কিন্তু হয়নি। ফেব্রুয়ারীতে চাকুরী থেকে তার অবসর, ভেবেছিলেন অবসরের আগে প্রমোশানটা হবে....... কিন্তু সেই প্রমোশান আর হলনা। সেই ক্ষোভে আমার ব্যাপারে এভাবে বলতেও কুন্ঠাবোধ করলেননা তিনি।
১৫ নভেম্বর ২০০৯…. সন্ধ্যা ৭টা…. Zia International Airport….
-আম্মু, একি অবস্থা??? চারদিকে এত্তোও ধোঁয়া কেন?? চারদিক এতো হলুন কেন??? আকাশটা এমন লাল হয়ে আছে কেন????
- লাল হয়ে আছে??? কই?? সব ঠিকই তো আছে.......
- উহু, মোটেও ঠিক নাই। আমি যাবার সময় তো এমন দেখে যায়নি, এখন কেন এমন মনে হচ্ছে???
- ৬ মাস বিদেশ থেকেই এই অবস্থা!!! আকাশ লাল, চারদিকে ধোঁয়া, যেদিকে তাকাস সেদিকেই হলুদ হলুদ দেখিস.…. এতো খুবই খারাপ লক্ষণ!!! মনে হচ্ছে যেন ১৫ বছর পর দেশে আসলি!!!
- হুমমম….. আমারও তাই মনে হয়…… :-( আমার দেশটা এমন কেন দেখতে???
এক সেমিস্টার শেষ করে ছয় মাস পর দেশে ফেরার পর আমার প্রতিক্রিয়া ছিল এমনই। সেইইইই ছোট্টবেলায় আমার মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটির জবাব আমি এভাবেই পেলাম। সেই ছোট্ট ছেলেটির প্রশ্ন ছিল- মানুষ এমেরিকা যায়, তারা কেন আর দেশে ফিরে আসেনা??? কিসের লোভে তারা এই সুন্দর দেশটাকে ভুলে যেতে পারে??? তাদেরকে ঘৃণা করতাম মনে-প্রাণে.........
কিন্তু....... যাদের আমি ঘৃণা করতাম, আজ আমি তাদেরই দলে!!! অদ্ভূত এই পৃথিবী!!!! হয়তো আমারও আর স্থায়ীভাবে দেশে ফেরা হবেনা। আর আমার এ ব্যাপারে আব্বুর কড়া নিষেধাজ্ঞা আমার দেশে ফেরার ইচ্ছাকে আরো চুপসিয়ে দিয়েছে যেন........
৩ জানুয়ারী ২০১০…. রাত ১.৩০ টা…. ভার্সিটি হোস্টেল….
বসে আছি ল্যাপটপের সামনে। নতুন বছর আসার পর........ অতীতের মাঝে ডুবে গিয়ে বের করার চেষ্টা করছি কিছু দুঃসহ স্মৃতি, কিছু অভিজ্ঞতা…. এবং কিছু গল্প। কিভাবেই যেন পার হয়ে গেল সময়গুলো...... কিভাবেই যেন পালটে যায় মানুষের জীবন...... উত্তরমেরু থেকে দক্ষিণমেরু এক সেকেন্ডে পারি দেয়া অসম্ভব, কিন্তু মানুষের জীবনের ঘটনাগুলোতে উত্তরমেরু থেকে রাতারাতি দক্ষিণমেরুতে চলে যাওয়া যেন খুব খুবই সম্ভব!!! যে তারিক আগে আম্মুর বকুনি খেয়ে কাঁদত, আজ সে আম্মুর স্নেহমাখা বকুনি না পেয়ে কাঁদে....... যে তারিক আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে নিজের BUET-এ পড়ালেখার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাবার কারণে কাঁদত, সেই তারিক আজ সেদিন BUET-এ এডমিশান হয়নি বলেই খুশি...... যে তারিক সাত মাস আগেও জানতনা তার ভবিষ্যত কোথায়, সে আজ MIT –তে পড়ালেখা করার স্বপ্ন দেখে!!!........... এ দুনিয়ার সব কিছুই আসলে অদ্ভূত!!!!!!

আসলেই অদ্ভূত!! স্বপ্ন সত্য হোক তোমার...
উত্তরমুছুনভাল লেখেছ তারিক। আসলে এই রকমই মানুষের জীবন।
উত্তরমুছুনআমিও তোমার মত বুয়েট এ চান্স না পেয়ে অনেক মন খারাপ করেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি , বুয়েটে না পড়তে পারা আমার জন্য ভাল ছিল। :)
jibon maney bohota nodi theme seto thakena>>>>
উত্তরমুছুনsundor hoise...but 2008 e HSC result publish hoise to 10 th september.5 th august e tui kemne result paili?
উত্তরমুছুন