বসে ছিলাম লাইব্রেরীর সামনে, রিসার্চ & ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এর পাশের এক বেঞ্চিতে। সবাই বলে এখানেই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াই-ফাই এর সবচাইতে ভালো সিগনাল পাওয়া যায়। লাইব্রেরী খুলবে সকাল ৮টায়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আরো ১৫ মিনিট বাকি। এই ফাঁকে মেইলগুলো চেক করে ফেলা যাক, ল্যাপ্পি বের করে জিমেইলে লগিন করতে না করতেই দেখলাম বেশ দূরে এক বাংলাদেশী ভাই নাসির হেঁটে যাচ্ছেন, তবে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন, স্টাফ। চোখাচোখি হতেই দূর থেকে হাত নাড়িয়ে সালাম দিলাম। কিন্তু একটা মজার ব্যাপার হলো, 'আসসালামু আলাইকুম' না বলে শুধু হাত নাড়ালেই কি সালাম দেয়া হয়ে যায়? এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর যে সংস্কৃতিটা আমার সবচাইতে ভালো লেগেছিলো তা হলো একজনের সাথে আরেকজনের দেখা-সাক্ষাৎ হলে সবাই খোঁজ-খবর নেয়, কেমন আছি-পড়ালেখা কেমন হচ্ছে-ভালো আছি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এ কাজে বিদেশী ছাত্রদেরকেই বেশী আগ্রহী দেখেছি বাংলাদেশী ছাত্রদের চাইতে। আসলে ছোটবেলা থেকেই ওদের সংস্কৃতিটা এতো অদ্ভূত সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে যে এসকল কাজকে ওরা আবশ্যকীয় কর্তব্য হিসেবেই ভাবে যা আমরা ভাবিনা। এ কারণেই হয়তো কারো সাথে বেশ দূর থেকে দেখা হলে দূর থেকে হাত নাড়িয়ে ও একই সময় মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে সালাম দেয় ওরা। এটা সবার মধ্যেই প্রচলিত এখানে। এ জন্য নিজের অজান্তেই ঘটে এখন এটা। নাসির ভাইর সাথে চোখাচোখি হতেই দু'জনেই একইভাবে সালাম দিলাম। সালাম দিয়েই আমি আবার মেইল চেকিং এ মগ্ন হয়ে পড়লাম, খেয়াল করিনি যে উনি আমার দিকেই আসছেন। জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছি-দেশে কবে যাবো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও এই সুযোগে কথা বলা শুরু করলাম……
নাসির ভাইর সাথে কখনো তেমন ভালোভাবে কথা হয়নি, ক্যাম্পাসেই দেখি মাঝে মাঝে। উনি কোথায় থাকেন কি করেন তাও জানিনা। দেখা হলে সালাম দেই, এর বেশি আর কিছু করার থাকেনা কারণ যখন দেখা হয় তখন আমি হয়তো ক্লাস বা ল্যাব এর দিকে দৌঁড়াচ্ছি। হয়তোবা ওনার খোঁজ নেয়া যেতো, কিন্তু তা করা হয়নি এটাই আমার ব্যর্থতা। ভাবলাম আজ কথা শুরু করি। কিভাবে শুরু করা যায়?? আমি কবে দেশে যাচ্ছি এর উত্তর দেয়ার পর আমিও জিজ্ঞেস করলাম আপনি কবে যাচ্ছেন দেশে?
নাসির ভাইঃ এই দেশে আইছি আড়াই বছর হইলো, ৫ বছরের কন্ট্রাক্টে আইছিলাম, শেষ হইলেই চইলা যামু।
আমিঃ এর মধ্যে দেশে যাওয়ার প্ল্যান নেই?
নাসির ভাইঃ নাহ্!! ৫ বছরের কট্রাক্ট শেষ কইরা এক্কেরে দেশে যামুগা।
আমিঃ কেনো? এতো তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন যে?
নাসির ভাইঃ বিদেশে আইসা কোনো লাভ হয়নাই আমার, বরং অনেক লস হইছে। হেল্লাইগা যামুগা, দেশে যায়া ব্যবসা-পাতি করুম আরকি।
আমিঃ বিদেশে লাভ হয়নাই মানে? দেশে কি আরো ভালো চাকুরি ছিলো?
নাসির ভাইঃ হ ভাই দেশে যা করতাম তাতে হাতে আরো বেশি টাকা থাকতো, তয় এখানে এসে সেটা নাই আর।
আমিঃ কেনো এই অবস্থা কিভাবে হলো? দেশে ভালো চাকুরি থাকলে এখানে এসেছিলেন কেনো?
নাসির ভাইঃ আমি দেশে এক কোম্পানীতে অফিসে চাকুরি করতাম ১৫,০০০ টাকার মতো বেতন ছিলো। এখানে আসছিলাম এক ওষুধ কোম্পানীতে কাজ করার জন্য, কিন্তু আমার সাথে বাট্পারি কইরা আরেক চাকরি দিছে।
আমিঃ ওহ্!! এটাতো অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। যাক কি আর করা……
নাসির ভাইঃ হ, তয় বিদেশে আইসা যে শুধু লস্ হইছে তা না, অন্য অনেক দিক দিয়া লাভও হইছে।
আমিঃ হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। বিদেশ জীবন মানেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা, কঠিন জীবন, এ অভিজ্ঞতা কয়জনের কপালে জোটে?? দেখবেন একদিন এই অভিজ্ঞতাই আপনাকে অনেক সাহায্য করছে।
নাসির ভাইঃ হ ঠিক বলছেন ভাই। তয় আমার অভিজ্ঞতাটা আরো ভিন্ন অন্যদের চাইতে।
আমিঃ কিরকম??
নাসির ভাইঃ বিদেশ আইসা আমার চোখ খুইলা গেছে। এদেশের মানুষের ব্যবহার, সংস্কৃতি সবকিছু দেইখা আমি মুগ্ধ।
আমিঃ হুম, এটা খুবই স্বাভাবিক।
নাসির ভাইঃ আমি দেশে থাকতে কোম্পানীর অফিসে বসে কাজ করতাম, আর এখানে আমাকে করতে হইছে বাবুর্চির কাজ, ক্লিনারের কাজ। কিন্তু একটা জিনিষ আমি দেখছি তা হলো এখানে কেউ কখনো আমাকে এতোটা অমার্যাদা করেনাই যতোটা বাংলাদেশে এই কাজের মানুষদের করা হয়।
আমিঃ ঠিক বলেছেন ভাই, এজন্যই ওরা এতো এগিয়ে গিয়েছে, আর আমরা অনেক মেধাবী বুদ্ধিমান হয়েও পিছিয়ে আছি।
নাসির ভাইঃ আমি চাকরি করতাম এক বড়সড় কন্ফেকশনারী আর হোটেলে। বিশাল বড় কোম্পানী এইটা। আমি রান্না করার সময় এই কোম্পানীর মালিক নিজে এসে আমার কাজে সাহায্য করতো, পিঁয়াজ কেটে দিতো, আলু কেটে দিতো, আরো অনেকভাবে সাহায্য করতো। আমি বলতাম, "স্যার আপনি এখানে কেনো? এইটা আমার কাজ আমাকে করতে দেন"। স্যার বলতো, "আরে বেকুব তোকে একটু সাহায্য করলে তো তোর কাজ আরো সহজ হয়ে গেলো"। এসব জিনিষ কেটে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় উনি শরবত বানায় দিয়ে যাইতেন, চুলায় চা বসায় দিয়ে যাইতেন আর যাওয়ার সময় বলতেন, "কাজের ফাঁকে ফাঁকে এগুলো খাইস"।
আমিঃ হ্যাঁ ভাই, এই আসল জায়গাটাতেই ওরা অনেক ভালো। যা আমরা পারিনা।
নাসির ভাইঃ হ, আর আমি যখন দেশে ছিলাম, তখন দেখতাম কোম্পানীর হেড এর লগে দেখা করা তো বহুত কঠিক কাজ। আগে থেকেই ১০ বার অনুমতি নেয়া লাগতো, অনুমতি মেলার পরও সামনে যায়া কুজা হয়া থাকতে হইতো। আর এখানে, কোম্পানীর হেড নিজে আইসা আমার লগে পিয়াঁজ কাটে, আমার লাইগা চা-শরবত বানায় দিয়া যায়।
আমিঃ হুমমম…… [আসলে আমার কিছুই বলার ছিলোনা তখন, শুধু ওনার অভিজ্ঞতার কথা তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। কিছু নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তব সত্যের এমন জীবন্ত বর্ণনা তন্ময় হয়ে শুনছিলাম]
নাসির ভাইঃ ভাই আপনারে একটা কথা কই। এদেশে আইসা আমার দুই চোখ খুইল্যা গেছে। আমি যে কোম্পানীতে চাকুরি করতাম, যেখানে আমার ডেস্ক আছিল্, হের পাশ দিয়া ক্লিনারদের আসা-যাওয়ার রাস্তা ছিলো আর কি, যার কারণে গন্ধ আসতো যা আমার সহ্য হইতোনা। আসলে সমস্যা ছিলো আমার, আমার নিজের মনই অহংকার এর গন্ধে ভরা ছিলো, এ জন্য আমি কোম্পানীর কাছে নালিশ দিয়া ওদের এই আসা-যাওয়ার রাস্তাটা বন্ধ কইরা দিছিলাম। সেই আমি এরপর মালয়েশিয়া আইসা ক্লিনারের কাজ করছি! ভাগ্যের কি খেলা ভাই দেখছেন? আমি ক্লিনার হওয়ার পর আমি বুঝছি যে আমি আসলে তখন কি অপরাধ করছিলাম। ক্লিনার এর পর বাবুর্চির চাকুরি করছি, আর এরপর তো আল্লাহর রহমতে আপনেগো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি হয়া গেলো, এখন আগের চাইতে পরিশ্রমও অনেক কম। তবে বেতন তো দেশে যা পাইতাম তার চাইতে অনেক কম।
আমিঃ হুমমম......
নাসির ভাইঃ আসলে আমাদের আচার-ব্যবহার অনেক খারাপ। আমাদের সংস্কৃতিই এমন। এই যে এত্তো দেশের এত্তো ধরনের স্টুডেন্ট পড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, সবার লগেই আমার কথা হয়, কিন্তু কোনো বাংলাদেশী স্টুডেন্ট এর লগে কথা হয়না। এই যে আজকে বহুদিন পর আপনার লগে কইতাছি, এমনিতে কইনা।
আমিঃ [আমি বুঝতে পারলাম কেন উনি এই কথা বলেন। আসলে আমাদের বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের মনের মধ্যে একটা তীব্র অহংকারবোধ কাজ করে, আর তা হলো "আমরা এদেশে পড়ালেখা করতে এসেছি, কাজ করতে নয়"। যার কারণে যে সকল বাংলাদেশী কাজ করতে এসেছেন তাদের সাথে বেশিরভাগ স্টুডেন্টেরই ব্যবহার খুব খারাপ। কথাবার্তা তো দূরে থাক, দেখলে উল্টো নাক সিট্কিয়ে দূরে সরে যায়!
আর আরেকটা বিষয় হলো, বাংলাদেশী স্টুডেন্টরা নিজেদের মধ্যেই থাকে, বিদেশী স্টুডেন্টদের সাথে মেলামেশা কম করে। যার কারণে তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু শেখার সুযোগ তাদের হয়ে উঠেনা, ওরা ট্র্যাডিশানাল বাঙ্গালীই থেকে যায়]
নাসির ভাইঃ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাজ হইলো পরীক্ষা হওনের সময় বিভিন্ন হলে সিটগুলা ঠিক করা। মাঝে মাঝে অনেক কাজ করতে গিয়ে ঘামে ভিইজ্যা একাকার হইয়া যাই। তখন যেসব মালয় বা বিদেশী স্টুডেন্টগো লগে পরিচয় আছে হেরা কয়, "ভাই তুমি তো বেশ ক্লান্ত, ঘামায় গেছ, একটু বিশ্রাম নাও, ঠাণ্ডা কিছু খাও"। কিন্তু কোনো বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কয়না। জানি আপনেরা আমগোরে ঘৃণা করেন কিন্তু আমরা তা করিনা ভাইজান, কারণ আপনারা এত্তো দূরে পড়তে আইছেন আপনারা হইলেন আমাদের গর্ব। এখানে বেবাক স্টুডেন্ট মোর চাইতে বয়সে অনেক ছোডো, তারপরও 'আপনি' কইরা কই, সম্মান করি। কিন্তু আপনাদের আচার-ব্যবহার যদি এমন হয় তাইলে কেমনে হইলো?
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতাম, সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যানের লগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছিল্। উনি একদিন আমারে একটা কথা কইছিলেন যা আমি আজীবন মনে রাখুম ভাই। উনি কইছিলেন, "নাসির, একজন মানুষ যতই শিক্ষিত হোক না কেনো, যতই যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট থাকুকনা কেনো, তার আচার-ব্যবহার-ভদ্রতাই হলো তার আসল পরিচয়। এসব যদি খারাপ হয় তাহলে সে একজন গণ্ডমূর্খের চাইতেও খারাপ"। স্যারের হেই কথাডা মোর আজীবন মনে থাকবো।
আমিঃ জ্বি।
নাসির ভাইঃ আপনারে একখান কাহিনী কই ভাইজান। আমার জীবনে বাংলাদেশী স্টুডেন্টগো ব্যবহার নিয়া অনেক কাহিনীই আছে, এর মধ্যে একটা কই। একদিন ফারুক ক্যান্টিনে সব বাংলাদেশী স্টুডেন্ট আইছিলো, প্রায় ২ বছর আগের কথা। ঐদিন মনে হয় কোনো ক্রিকেট ম্যাচ আছিল্ হেইডা দেখবার লাইগা সবাই আইছিলো, ক্যান্টিন এক্কেরে কানায় কানায় ভইরা গেছিলো। আমি খাওন কিইন্যা সিট খুঁজতাছি কোনহানে বহা যায়, ক্যান্টিনের এক বেঞ্চে তো ৪ জন বইতে পারে, এক বেঞ্চে দেখলাম ১টা সিট খালি আছে। যায়া ঐ সিটে বইলাম, লগে আমার পাশে যেই ভাইজান বয়া আছিল্ হে উইঠ্যা গেলোগা। আমি খুব কষ্ট পাইলাম। পরে জানতে পারলাম যে আমি একজন শ্রমিক বইল্যা হে ঐখান থেইক্যা উইঠ্যা গেছিলো, তার কথা হইলো যে, "সে একজন শ্রমিক হইয়া আমার পাশে বসে কোন সাহসে?"
আমিঃ [আমি কিই বা বলতে পারি? লজ্জায় ওনার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি, চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম আসলে আমরা কি জন্য এই পড়ালেখা শিখছি?]
নাসির ভাইঃ ভাই তয় আমি খুব খুশি যে আল্লাহ আমার ভুল টা শুধরায় দিছে। আমার মধ্যে এখন আর আগের মতো অহংকার নাই। আমি নিজেকে খুব ছোটো মনে করি, খুবই ধিক্কার দেই, আমি অনেক ছোটো মানুষ। তয় আমার কাছে সবাই সমান। আমি এখন একজন মেথরের লগে বইসাও এক প্লেটে ভাত খাইতে পারমু। আমি দেশে যামু যহন তহন চেষ্টা করমু আমার লগে যারা আছে হেগোরে এগুলো বুঝাইতে। কিন্তু আমি জানি এগুলো বাঙ্গালীরা বুঝবোনা কারণ বাঙ্গালীদের সংস্কৃতির মধ্যেই এগুলা ঢুইক্যা গেছে, হেগো দোষ দিয়া কোনো লাভও নাই।
আমিঃ ঠিকই বলছেন ভাই, এদেশের মানুষগুলো এই ব্যবহারগুলো ওদের পরিবার থেকেই শিখে থাকে ছোটোবেলা থেকেই, যা আমাদের দেশে হয়না। এদের কাছে এগুলোই স্বাভাবিক আচরণ, কিন্তু আমাদের দেশে এগুলো বেশ মহৎ আচরণ।
সকাল ৯ টা বেজে গেলো, আমি এখনো নাস্তা করিনি চলেন নাস্তা করে আসি।
নাসির ভাইঃ না ভাই আমি নাস্তা করেছি, আপনি যায়া তাড়াতাড়ি নাস্তা করেন। ভাই আপনারাই আমগো দেশের সম্পদ। ভালোভাবে থাকবেন আর দেশের জন্য কিছু করবেন এইডাই আমগো প্রত্যাশা। এ জন্যই সবকিছু চোখ বুইঝ্যা সহ্য কইরা যাই।
আমিঃ জ্বি ভাই ঠিক বলছেন, শুধু আমরা না আপনারাও দেশের জন্য সম্পদ। সবাই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শুধু আমরা না। যাই হোক, ভালো থাকবেন, আরেকদিন কথা হবে ইনশাল্লাহ। আল্লাহ হাফিজ।
নাসির ভাইঃ আল্লাহ হাফিজ।
নাসির ভাইর সাথে কথা শেষ করে চলে এলাম HS ক্যান্টিনে, নাস্তা খেতে খেতে ভাবছি আসলে আমরা বাংলাদেশীরা এমন কেনো? বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাদের এতো বড় করেছেন এবং এরপর এই দূরদেশে পাঠিয়েছেন পড়ালেখা করার জন্য। কিন্তু আমাদের ছাত্রদের এই দশা কেনো? জানিনা তাদের জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটাই বা কি? আসলে তারা নিজেরাই জানেনা তারা কেন পড়ালেখা করছে বা পড়ালেখা কেন করছে…… এখানে আমরা জ্ঞানার্জনের জন্য এসেছি, সার্টিফিকেট অর্জন কিন্তু আসল উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বেশিরভাগ স্টুডেন্টই সার্টিফিকেট এর জন্যই দৌঁড়ায়।
এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে নিজেকে ও নিজের জাতির মানুষদেরকে যতটুকু বিচার করে দেখেছি তাতে আমি মনে করি আমাদের স্টুডেন্টদের যেমন দোষ আছে, ঠিক তেমনি দোষ রয়েছে আমাদের পিতা-মাতার ও পারিবারিক শিক্ষার। বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের দশা নিয়ে কিছু লেখার বা কিছু বলার চিন্তা এর আগে আমার মাথায় আসেনি। আজ এই সুযোগে বলেই ফেলি…… এরপর আসবো পিতা-মাতার ব্যাপারে……
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৯০ টা দেশের ছাত্র-ছাত্রী আছে। কিন্তু বেশিরভাগ বাংলাদেশী ছাত্র নিজেদের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে, কারণ আমরা আড্ডাবাজ, ফালতু প্যাঁচাল আর ফালতু বকবক করতে ওস্তাদ যা অন্যরা পারেনা আমাদের মতো করে। আর এজন্যই আমরা আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি, বিদেশী বন্ধুদের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু শেখা ও জানা যায় যার আগ্রহ আমাদের নেই। তারপরও আমরা এত্তো ফালতুভাবে সময় নষ্ট করে খুব অল্প পরিশ্রমেই মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করতে পারি; আর ভালোভাবে পড়লে তো কথাই নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র হওয়াও কোনো ব্যাপার না। অন্যান্য দেশের স্টুডেন্টরা এতো সহজে এটা পারেনা, কিন্তু চরিত্র-আচার-ব্যবহার এর দিক দিয়ে তারা আমাদের চাইতে হাজার হাজারগুণ উপরে। আর তাছাড়া এতো মেধা থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের এই মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার না করে জীবনকে 'উপভোগ' করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেই।
আমাদের মাথায় কি এ বিষয়টা একটুও কাজ করেনা আমাদের মা-বাবার আদরের সন্তান হয়েও কিভাবে দিনের পর দিন অর্থহীনভাবে সময় ও অর্থ অপচয় করতে থাকি? মা-বাবা খেয়ে না খেয়ে তাদের সারাজীবনের কষ্টে অর্জিত সম্পদ ঢেলে দেন আমাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য, আর আমরা সেই অর্থ ব্যয় করি অর্থহীন সব কাজে, ফূর্তিতে। সারাবিশ্বে এমন অনেক বাংলাদেশী স্টুডেন্ট রয়েছে পড়ালেখা করা যাদের আসল উদ্দেশ্য নয় এখন, বরং ফূর্তি করে সময় নষ্ট করাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আসল উদ্দেশ্য।
মেয়েবন্ধু, সিগারেট, বিয়ার, অর্থহীন আড্ডা যাদের নিত্যসঙ্গী। এদিক দিয়ে অনেক স্টুডেন্ট অর্থহীনভাবে অর্থের অপচয় করছে, আর অন্যদিক দিয়ে আরেক গরীব বাংলাদেশী স্টুডেন্ট জ্ঞানার্জনের অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে পড়ালেখা করতে পারছেনা।
এবার আসা যাক পিতা-মাতা ও পারিবারিক শিক্ষার ব্যাপারে, আমি মনে করি পরিবার থেকেই আমাদের সঠিক আচার-ব্যবহার-শিষ্টাচার শিক্ষার অনেক অভাব রয়ে গিয়েছে। নাহলে কেন আমাদের মনের মধ্যে এত্তো অহংকার এত্তো গর্ব থাকবে? কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও অন্য এক মানুষের পাশে বসতে পারিনা শুধুমাত্র তিনি 'শ্রমিক' বলে? আমরা আসলে কিসের পড়ালেখা শিখছি? শুধুই কি বইয়ের পাতা গিলছি এবং পরীক্ষার হলে গিয়ে তা 'বমি' করে ফেলে দিচ্ছি? এটাই কি পড়ালেখা? সেই ক্লাস ওয়ান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত বাংলাদেশে যতদিন আমার শিক্ষাজীবন ছিল, দীর্ঘ এই সময়ে আমি হাতেগোণা ক'জন শিক্ষক পেয়েছিলাম যারা আমাকে পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যান্য আচার-ব্যবহার-শিষ্টাচার শিখিয়েছেন। আমাদের পরিবার থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তার মধ্যেও রয়েছে অনেক ভুল। মা-বাবা চান যে তার সন্তান ক্লাসে '১ম' হবে, এবং এ বিষয়টা এতোই জরুরী যে ১ম না হলে সন্তানকে মারধর করতেও দ্বিধাবোধ করেননা তারা। শুধু তাই নয়, পরীক্ষার পূর্বে সন্তানকে বলে থাকেন যে "১ম হতে পারলে তোমাকে এটা কিনে দিবো, ঐটা কিনে দিবো" (যেমনঃ কম্পিউটার, খেলনা বা যে কোনো কিছু যা সন্তান খুব পছন্দ করে এবং পিতা-মাতার কাছে চায়)। যার ফলে সন্তান মনে করে ক্লাসে '১ম' হওয়াই হচ্ছে জীবনের সবচাইতে বড় উদ্দেশ্য। যার জন্য সে যেভাবেই হোক তা করার চেষ্টা করে, হতে পারে তা বই গিলে অথবা নকল করে অথবা পরীক্ষার হলে পাশেরজনের খাতা দেখে লিখে। আর তারপরও যদি সে '১ম' হতে না পারে তাহলে সে মনে করে তার চাইতে বড় অপরাধী এ দুনিয়ায় আর কেউ নেই। কিন্তু এমন পরিবার মনে হয় খুব কমই আছে যেখানে পিতা-মাতা তার সন্তানকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরী করতে চান, বইয়ের পাতার জ্ঞান গলধঃকরণ করে অতঃপর সেই জ্ঞান পরীক্ষার খাতার উপর বমি করে ফেলে দিয়ে '১ম স্থান' অধিকার চাইতে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জনে সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করেন, জ্ঞানার্জনের সত্যিকারের তৃপ্তি কিভাবে পেতে হয় এবং এই জ্ঞানকে কি করে দেশ-সমাজ-জাতির কাজে লাগানো যায় সে শিক্ষা দেন।
জানিনা এমন মানুষ দিয়ে আমাদের দেশ আগামীতে কিভাবে চলবে? কি করে এগিয়ে যাবে.....
http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=3764
http://www.sonarbangladesh.com/blog/TariqR/9109
http://www.somewhereinblog.net/blog/Tariq1990/29252358
নাসির ভাইর সাথে কখনো তেমন ভালোভাবে কথা হয়নি, ক্যাম্পাসেই দেখি মাঝে মাঝে। উনি কোথায় থাকেন কি করেন তাও জানিনা। দেখা হলে সালাম দেই, এর বেশি আর কিছু করার থাকেনা কারণ যখন দেখা হয় তখন আমি হয়তো ক্লাস বা ল্যাব এর দিকে দৌঁড়াচ্ছি। হয়তোবা ওনার খোঁজ নেয়া যেতো, কিন্তু তা করা হয়নি এটাই আমার ব্যর্থতা। ভাবলাম আজ কথা শুরু করি। কিভাবে শুরু করা যায়?? আমি কবে দেশে যাচ্ছি এর উত্তর দেয়ার পর আমিও জিজ্ঞেস করলাম আপনি কবে যাচ্ছেন দেশে?
নাসির ভাইঃ এই দেশে আইছি আড়াই বছর হইলো, ৫ বছরের কন্ট্রাক্টে আইছিলাম, শেষ হইলেই চইলা যামু।
আমিঃ এর মধ্যে দেশে যাওয়ার প্ল্যান নেই?
নাসির ভাইঃ নাহ্!! ৫ বছরের কট্রাক্ট শেষ কইরা এক্কেরে দেশে যামুগা।
আমিঃ কেনো? এতো তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন যে?
নাসির ভাইঃ বিদেশে আইসা কোনো লাভ হয়নাই আমার, বরং অনেক লস হইছে। হেল্লাইগা যামুগা, দেশে যায়া ব্যবসা-পাতি করুম আরকি।
আমিঃ বিদেশে লাভ হয়নাই মানে? দেশে কি আরো ভালো চাকুরি ছিলো?
নাসির ভাইঃ হ ভাই দেশে যা করতাম তাতে হাতে আরো বেশি টাকা থাকতো, তয় এখানে এসে সেটা নাই আর।
আমিঃ কেনো এই অবস্থা কিভাবে হলো? দেশে ভালো চাকুরি থাকলে এখানে এসেছিলেন কেনো?
নাসির ভাইঃ আমি দেশে এক কোম্পানীতে অফিসে চাকুরি করতাম ১৫,০০০ টাকার মতো বেতন ছিলো। এখানে আসছিলাম এক ওষুধ কোম্পানীতে কাজ করার জন্য, কিন্তু আমার সাথে বাট্পারি কইরা আরেক চাকরি দিছে।
আমিঃ ওহ্!! এটাতো অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। যাক কি আর করা……
নাসির ভাইঃ হ, তয় বিদেশে আইসা যে শুধু লস্ হইছে তা না, অন্য অনেক দিক দিয়া লাভও হইছে।
আমিঃ হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। বিদেশ জীবন মানেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা, কঠিন জীবন, এ অভিজ্ঞতা কয়জনের কপালে জোটে?? দেখবেন একদিন এই অভিজ্ঞতাই আপনাকে অনেক সাহায্য করছে।
নাসির ভাইঃ হ ঠিক বলছেন ভাই। তয় আমার অভিজ্ঞতাটা আরো ভিন্ন অন্যদের চাইতে।
আমিঃ কিরকম??
নাসির ভাইঃ বিদেশ আইসা আমার চোখ খুইলা গেছে। এদেশের মানুষের ব্যবহার, সংস্কৃতি সবকিছু দেইখা আমি মুগ্ধ।
আমিঃ হুম, এটা খুবই স্বাভাবিক।
নাসির ভাইঃ আমি দেশে থাকতে কোম্পানীর অফিসে বসে কাজ করতাম, আর এখানে আমাকে করতে হইছে বাবুর্চির কাজ, ক্লিনারের কাজ। কিন্তু একটা জিনিষ আমি দেখছি তা হলো এখানে কেউ কখনো আমাকে এতোটা অমার্যাদা করেনাই যতোটা বাংলাদেশে এই কাজের মানুষদের করা হয়।
আমিঃ ঠিক বলেছেন ভাই, এজন্যই ওরা এতো এগিয়ে গিয়েছে, আর আমরা অনেক মেধাবী বুদ্ধিমান হয়েও পিছিয়ে আছি।
নাসির ভাইঃ আমি চাকরি করতাম এক বড়সড় কন্ফেকশনারী আর হোটেলে। বিশাল বড় কোম্পানী এইটা। আমি রান্না করার সময় এই কোম্পানীর মালিক নিজে এসে আমার কাজে সাহায্য করতো, পিঁয়াজ কেটে দিতো, আলু কেটে দিতো, আরো অনেকভাবে সাহায্য করতো। আমি বলতাম, "স্যার আপনি এখানে কেনো? এইটা আমার কাজ আমাকে করতে দেন"। স্যার বলতো, "আরে বেকুব তোকে একটু সাহায্য করলে তো তোর কাজ আরো সহজ হয়ে গেলো"। এসব জিনিষ কেটে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় উনি শরবত বানায় দিয়ে যাইতেন, চুলায় চা বসায় দিয়ে যাইতেন আর যাওয়ার সময় বলতেন, "কাজের ফাঁকে ফাঁকে এগুলো খাইস"।
আমিঃ হ্যাঁ ভাই, এই আসল জায়গাটাতেই ওরা অনেক ভালো। যা আমরা পারিনা।
নাসির ভাইঃ হ, আর আমি যখন দেশে ছিলাম, তখন দেখতাম কোম্পানীর হেড এর লগে দেখা করা তো বহুত কঠিক কাজ। আগে থেকেই ১০ বার অনুমতি নেয়া লাগতো, অনুমতি মেলার পরও সামনে যায়া কুজা হয়া থাকতে হইতো। আর এখানে, কোম্পানীর হেড নিজে আইসা আমার লগে পিয়াঁজ কাটে, আমার লাইগা চা-শরবত বানায় দিয়া যায়।
আমিঃ হুমমম…… [আসলে আমার কিছুই বলার ছিলোনা তখন, শুধু ওনার অভিজ্ঞতার কথা তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। কিছু নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তব সত্যের এমন জীবন্ত বর্ণনা তন্ময় হয়ে শুনছিলাম]
নাসির ভাইঃ ভাই আপনারে একটা কথা কই। এদেশে আইসা আমার দুই চোখ খুইল্যা গেছে। আমি যে কোম্পানীতে চাকুরি করতাম, যেখানে আমার ডেস্ক আছিল্, হের পাশ দিয়া ক্লিনারদের আসা-যাওয়ার রাস্তা ছিলো আর কি, যার কারণে গন্ধ আসতো যা আমার সহ্য হইতোনা। আসলে সমস্যা ছিলো আমার, আমার নিজের মনই অহংকার এর গন্ধে ভরা ছিলো, এ জন্য আমি কোম্পানীর কাছে নালিশ দিয়া ওদের এই আসা-যাওয়ার রাস্তাটা বন্ধ কইরা দিছিলাম। সেই আমি এরপর মালয়েশিয়া আইসা ক্লিনারের কাজ করছি! ভাগ্যের কি খেলা ভাই দেখছেন? আমি ক্লিনার হওয়ার পর আমি বুঝছি যে আমি আসলে তখন কি অপরাধ করছিলাম। ক্লিনার এর পর বাবুর্চির চাকুরি করছি, আর এরপর তো আল্লাহর রহমতে আপনেগো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি হয়া গেলো, এখন আগের চাইতে পরিশ্রমও অনেক কম। তবে বেতন তো দেশে যা পাইতাম তার চাইতে অনেক কম।
আমিঃ হুমমম......
নাসির ভাইঃ আসলে আমাদের আচার-ব্যবহার অনেক খারাপ। আমাদের সংস্কৃতিই এমন। এই যে এত্তো দেশের এত্তো ধরনের স্টুডেন্ট পড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, সবার লগেই আমার কথা হয়, কিন্তু কোনো বাংলাদেশী স্টুডেন্ট এর লগে কথা হয়না। এই যে আজকে বহুদিন পর আপনার লগে কইতাছি, এমনিতে কইনা।
আমিঃ [আমি বুঝতে পারলাম কেন উনি এই কথা বলেন। আসলে আমাদের বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের মনের মধ্যে একটা তীব্র অহংকারবোধ কাজ করে, আর তা হলো "আমরা এদেশে পড়ালেখা করতে এসেছি, কাজ করতে নয়"। যার কারণে যে সকল বাংলাদেশী কাজ করতে এসেছেন তাদের সাথে বেশিরভাগ স্টুডেন্টেরই ব্যবহার খুব খারাপ। কথাবার্তা তো দূরে থাক, দেখলে উল্টো নাক সিট্কিয়ে দূরে সরে যায়!
আর আরেকটা বিষয় হলো, বাংলাদেশী স্টুডেন্টরা নিজেদের মধ্যেই থাকে, বিদেশী স্টুডেন্টদের সাথে মেলামেশা কম করে। যার কারণে তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু শেখার সুযোগ তাদের হয়ে উঠেনা, ওরা ট্র্যাডিশানাল বাঙ্গালীই থেকে যায়]
নাসির ভাইঃ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাজ হইলো পরীক্ষা হওনের সময় বিভিন্ন হলে সিটগুলা ঠিক করা। মাঝে মাঝে অনেক কাজ করতে গিয়ে ঘামে ভিইজ্যা একাকার হইয়া যাই। তখন যেসব মালয় বা বিদেশী স্টুডেন্টগো লগে পরিচয় আছে হেরা কয়, "ভাই তুমি তো বেশ ক্লান্ত, ঘামায় গেছ, একটু বিশ্রাম নাও, ঠাণ্ডা কিছু খাও"। কিন্তু কোনো বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কয়না। জানি আপনেরা আমগোরে ঘৃণা করেন কিন্তু আমরা তা করিনা ভাইজান, কারণ আপনারা এত্তো দূরে পড়তে আইছেন আপনারা হইলেন আমাদের গর্ব। এখানে বেবাক স্টুডেন্ট মোর চাইতে বয়সে অনেক ছোডো, তারপরও 'আপনি' কইরা কই, সম্মান করি। কিন্তু আপনাদের আচার-ব্যবহার যদি এমন হয় তাইলে কেমনে হইলো?
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতাম, সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যানের লগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছিল্। উনি একদিন আমারে একটা কথা কইছিলেন যা আমি আজীবন মনে রাখুম ভাই। উনি কইছিলেন, "নাসির, একজন মানুষ যতই শিক্ষিত হোক না কেনো, যতই যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট থাকুকনা কেনো, তার আচার-ব্যবহার-ভদ্রতাই হলো তার আসল পরিচয়। এসব যদি খারাপ হয় তাহলে সে একজন গণ্ডমূর্খের চাইতেও খারাপ"। স্যারের হেই কথাডা মোর আজীবন মনে থাকবো।
আমিঃ জ্বি।
নাসির ভাইঃ আপনারে একখান কাহিনী কই ভাইজান। আমার জীবনে বাংলাদেশী স্টুডেন্টগো ব্যবহার নিয়া অনেক কাহিনীই আছে, এর মধ্যে একটা কই। একদিন ফারুক ক্যান্টিনে সব বাংলাদেশী স্টুডেন্ট আইছিলো, প্রায় ২ বছর আগের কথা। ঐদিন মনে হয় কোনো ক্রিকেট ম্যাচ আছিল্ হেইডা দেখবার লাইগা সবাই আইছিলো, ক্যান্টিন এক্কেরে কানায় কানায় ভইরা গেছিলো। আমি খাওন কিইন্যা সিট খুঁজতাছি কোনহানে বহা যায়, ক্যান্টিনের এক বেঞ্চে তো ৪ জন বইতে পারে, এক বেঞ্চে দেখলাম ১টা সিট খালি আছে। যায়া ঐ সিটে বইলাম, লগে আমার পাশে যেই ভাইজান বয়া আছিল্ হে উইঠ্যা গেলোগা। আমি খুব কষ্ট পাইলাম। পরে জানতে পারলাম যে আমি একজন শ্রমিক বইল্যা হে ঐখান থেইক্যা উইঠ্যা গেছিলো, তার কথা হইলো যে, "সে একজন শ্রমিক হইয়া আমার পাশে বসে কোন সাহসে?"
আমিঃ [আমি কিই বা বলতে পারি? লজ্জায় ওনার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি, চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম আসলে আমরা কি জন্য এই পড়ালেখা শিখছি?]
নাসির ভাইঃ ভাই তয় আমি খুব খুশি যে আল্লাহ আমার ভুল টা শুধরায় দিছে। আমার মধ্যে এখন আর আগের মতো অহংকার নাই। আমি নিজেকে খুব ছোটো মনে করি, খুবই ধিক্কার দেই, আমি অনেক ছোটো মানুষ। তয় আমার কাছে সবাই সমান। আমি এখন একজন মেথরের লগে বইসাও এক প্লেটে ভাত খাইতে পারমু। আমি দেশে যামু যহন তহন চেষ্টা করমু আমার লগে যারা আছে হেগোরে এগুলো বুঝাইতে। কিন্তু আমি জানি এগুলো বাঙ্গালীরা বুঝবোনা কারণ বাঙ্গালীদের সংস্কৃতির মধ্যেই এগুলা ঢুইক্যা গেছে, হেগো দোষ দিয়া কোনো লাভও নাই।
আমিঃ ঠিকই বলছেন ভাই, এদেশের মানুষগুলো এই ব্যবহারগুলো ওদের পরিবার থেকেই শিখে থাকে ছোটোবেলা থেকেই, যা আমাদের দেশে হয়না। এদের কাছে এগুলোই স্বাভাবিক আচরণ, কিন্তু আমাদের দেশে এগুলো বেশ মহৎ আচরণ।
সকাল ৯ টা বেজে গেলো, আমি এখনো নাস্তা করিনি চলেন নাস্তা করে আসি।
নাসির ভাইঃ না ভাই আমি নাস্তা করেছি, আপনি যায়া তাড়াতাড়ি নাস্তা করেন। ভাই আপনারাই আমগো দেশের সম্পদ। ভালোভাবে থাকবেন আর দেশের জন্য কিছু করবেন এইডাই আমগো প্রত্যাশা। এ জন্যই সবকিছু চোখ বুইঝ্যা সহ্য কইরা যাই।
আমিঃ জ্বি ভাই ঠিক বলছেন, শুধু আমরা না আপনারাও দেশের জন্য সম্পদ। সবাই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শুধু আমরা না। যাই হোক, ভালো থাকবেন, আরেকদিন কথা হবে ইনশাল্লাহ। আল্লাহ হাফিজ।
নাসির ভাইঃ আল্লাহ হাফিজ।
নাসির ভাইর সাথে কথা শেষ করে চলে এলাম HS ক্যান্টিনে, নাস্তা খেতে খেতে ভাবছি আসলে আমরা বাংলাদেশীরা এমন কেনো? বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাদের এতো বড় করেছেন এবং এরপর এই দূরদেশে পাঠিয়েছেন পড়ালেখা করার জন্য। কিন্তু আমাদের ছাত্রদের এই দশা কেনো? জানিনা তাদের জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটাই বা কি? আসলে তারা নিজেরাই জানেনা তারা কেন পড়ালেখা করছে বা পড়ালেখা কেন করছে…… এখানে আমরা জ্ঞানার্জনের জন্য এসেছি, সার্টিফিকেট অর্জন কিন্তু আসল উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বেশিরভাগ স্টুডেন্টই সার্টিফিকেট এর জন্যই দৌঁড়ায়।
এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে নিজেকে ও নিজের জাতির মানুষদেরকে যতটুকু বিচার করে দেখেছি তাতে আমি মনে করি আমাদের স্টুডেন্টদের যেমন দোষ আছে, ঠিক তেমনি দোষ রয়েছে আমাদের পিতা-মাতার ও পারিবারিক শিক্ষার। বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের দশা নিয়ে কিছু লেখার বা কিছু বলার চিন্তা এর আগে আমার মাথায় আসেনি। আজ এই সুযোগে বলেই ফেলি…… এরপর আসবো পিতা-মাতার ব্যাপারে……
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৯০ টা দেশের ছাত্র-ছাত্রী আছে। কিন্তু বেশিরভাগ বাংলাদেশী ছাত্র নিজেদের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে, কারণ আমরা আড্ডাবাজ, ফালতু প্যাঁচাল আর ফালতু বকবক করতে ওস্তাদ যা অন্যরা পারেনা আমাদের মতো করে। আর এজন্যই আমরা আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি, বিদেশী বন্ধুদের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু শেখা ও জানা যায় যার আগ্রহ আমাদের নেই। তারপরও আমরা এত্তো ফালতুভাবে সময় নষ্ট করে খুব অল্প পরিশ্রমেই মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করতে পারি; আর ভালোভাবে পড়লে তো কথাই নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র হওয়াও কোনো ব্যাপার না। অন্যান্য দেশের স্টুডেন্টরা এতো সহজে এটা পারেনা, কিন্তু চরিত্র-আচার-ব্যবহার এর দিক দিয়ে তারা আমাদের চাইতে হাজার হাজারগুণ উপরে। আর তাছাড়া এতো মেধা থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের এই মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার না করে জীবনকে 'উপভোগ' করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেই।
আমাদের মাথায় কি এ বিষয়টা একটুও কাজ করেনা আমাদের মা-বাবার আদরের সন্তান হয়েও কিভাবে দিনের পর দিন অর্থহীনভাবে সময় ও অর্থ অপচয় করতে থাকি? মা-বাবা খেয়ে না খেয়ে তাদের সারাজীবনের কষ্টে অর্জিত সম্পদ ঢেলে দেন আমাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য, আর আমরা সেই অর্থ ব্যয় করি অর্থহীন সব কাজে, ফূর্তিতে। সারাবিশ্বে এমন অনেক বাংলাদেশী স্টুডেন্ট রয়েছে পড়ালেখা করা যাদের আসল উদ্দেশ্য নয় এখন, বরং ফূর্তি করে সময় নষ্ট করাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আসল উদ্দেশ্য।
মেয়েবন্ধু, সিগারেট, বিয়ার, অর্থহীন আড্ডা যাদের নিত্যসঙ্গী। এদিক দিয়ে অনেক স্টুডেন্ট অর্থহীনভাবে অর্থের অপচয় করছে, আর অন্যদিক দিয়ে আরেক গরীব বাংলাদেশী স্টুডেন্ট জ্ঞানার্জনের অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে পড়ালেখা করতে পারছেনা।
এবার আসা যাক পিতা-মাতা ও পারিবারিক শিক্ষার ব্যাপারে, আমি মনে করি পরিবার থেকেই আমাদের সঠিক আচার-ব্যবহার-শিষ্টাচার শিক্ষার অনেক অভাব রয়ে গিয়েছে। নাহলে কেন আমাদের মনের মধ্যে এত্তো অহংকার এত্তো গর্ব থাকবে? কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও অন্য এক মানুষের পাশে বসতে পারিনা শুধুমাত্র তিনি 'শ্রমিক' বলে? আমরা আসলে কিসের পড়ালেখা শিখছি? শুধুই কি বইয়ের পাতা গিলছি এবং পরীক্ষার হলে গিয়ে তা 'বমি' করে ফেলে দিচ্ছি? এটাই কি পড়ালেখা? সেই ক্লাস ওয়ান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত বাংলাদেশে যতদিন আমার শিক্ষাজীবন ছিল, দীর্ঘ এই সময়ে আমি হাতেগোণা ক'জন শিক্ষক পেয়েছিলাম যারা আমাকে পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যান্য আচার-ব্যবহার-শিষ্টাচার শিখিয়েছেন। আমাদের পরিবার থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তার মধ্যেও রয়েছে অনেক ভুল। মা-বাবা চান যে তার সন্তান ক্লাসে '১ম' হবে, এবং এ বিষয়টা এতোই জরুরী যে ১ম না হলে সন্তানকে মারধর করতেও দ্বিধাবোধ করেননা তারা। শুধু তাই নয়, পরীক্ষার পূর্বে সন্তানকে বলে থাকেন যে "১ম হতে পারলে তোমাকে এটা কিনে দিবো, ঐটা কিনে দিবো" (যেমনঃ কম্পিউটার, খেলনা বা যে কোনো কিছু যা সন্তান খুব পছন্দ করে এবং পিতা-মাতার কাছে চায়)। যার ফলে সন্তান মনে করে ক্লাসে '১ম' হওয়াই হচ্ছে জীবনের সবচাইতে বড় উদ্দেশ্য। যার জন্য সে যেভাবেই হোক তা করার চেষ্টা করে, হতে পারে তা বই গিলে অথবা নকল করে অথবা পরীক্ষার হলে পাশেরজনের খাতা দেখে লিখে। আর তারপরও যদি সে '১ম' হতে না পারে তাহলে সে মনে করে তার চাইতে বড় অপরাধী এ দুনিয়ায় আর কেউ নেই। কিন্তু এমন পরিবার মনে হয় খুব কমই আছে যেখানে পিতা-মাতা তার সন্তানকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরী করতে চান, বইয়ের পাতার জ্ঞান গলধঃকরণ করে অতঃপর সেই জ্ঞান পরীক্ষার খাতার উপর বমি করে ফেলে দিয়ে '১ম স্থান' অধিকার চাইতে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জনে সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করেন, জ্ঞানার্জনের সত্যিকারের তৃপ্তি কিভাবে পেতে হয় এবং এই জ্ঞানকে কি করে দেশ-সমাজ-জাতির কাজে লাগানো যায় সে শিক্ষা দেন।
জানিনা এমন মানুষ দিয়ে আমাদের দেশ আগামীতে কিভাবে চলবে? কি করে এগিয়ে যাবে.....
http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=3764
http://www.sonarbangladesh.com/blog/TariqR/9109
http://www.somewhereinblog.net/blog/Tariq1990/29252358
very very emotional. you spoke my heart. i really wish i met nasir bhai in 08.
উত্তরমুছুনআসলে... বুঝতে পারছিনা কী বলব! চমৎকার লেখা, বেশ কিছু উপলব্ধি আছে কিন্তু বলার কিছুই নেই...
উত্তরমুছুনদারুন!
উত্তরমুছুনআরেকটা কথা, আপনি খুব ভালো ছবি তোলেন।
super like
উত্তরমুছুন